1. ahmedshuvo@gmail.com : admi2018 :
  2. mridubhashan@gmail.com : Mridubhashan .Com : Mridubhashan .Com

সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৬:০০ অপরাহ্ন

নারী তুমি নিরাপদ কোথায়?

সেলিম আহমেদ :: কিছু দিন থেকে বিষন্নতা গ্রাস করেছে আমায়। পত্রিকায় পাতা উল্টালে কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ঢু মারলেই চোখে পড়ে ধর্ষণ আর শ্লীলতাহানীর খবর। বিষয়টি পীড়া দেয় আমায়। দেশে প্রতিদিন অসংখ্য নারীকে ধর্ষিত হতে হচ্ছে। শ্লীলতাহানী, লাঞ্ছিত আর ইভটিজিংয়ের কথা নাই বা বললাম। আজ নারী কোথাও নিরাপদ নয়। না ঘরে, না বাইরে, না কর্মস্থলে। আজ ভাইয়ের কাছে বোন, ডাক্তাকের কাছে রোগী, শিক্ষকের কাছে শিক্ষার্থী, চালকের কাছে যাত্রী এমনকি মসজিদের হুজুর আর আইনশৃঙ্খলা বাহীনির কাছে নারী নিরাপদ হয়।

দেশ স্বাধীন হওয়ার ৪৭ বছর পরও নারীদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারেনি রাষ্ট্র ব্যাবস্থা। অথচ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭-এ বলা হয়েছে, ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী’। পশ্চাৎপদ নারী জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নেয়ার জন্য সংবিধানের ২৮(১), (২), (৩) এবং (৪) ধারায় নারীর অধিকারকে নিশ্চিত করা হয়েছে। রাষ্ট্র নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, এটাই কাম্য। কিন্তু, নাগরিক সাধারণের নিরাপত্তা দিতে রাষ্ট্র চরম ব্যর্থ হচ্ছে। হত্যা, গুম, জখম, রক্তারক্তি, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং নির্বাচনী যুদ্ধ- সর্বত্র নারী ও শিশুরা নির্যাতনের বিশেষ লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে।

যেখানে নারী অধিকতর নিরাপত্তার দাবি রাখে, সেখানে নেই তাদের কোন নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আমাদের দেশের সমাজ ব্যবস্থাও আজ পর্যন্ত নারীদের সম্মন দিতে পারে নাই। একটি মেয়ে জন্ম নেয়ার পরপরই পড়ে যায় মা-বাবা আর স্বজনদের রোষানলে। অনেকে গর্ভে মেয়ে শুনলেই এব্রশোন করিয়ে ফেলে। কোন কোন পরিবারে পরপর ২-৩ টি মেয়ে সন্তান জন্ম নিলেই স্ত্রী ওপর নেমে আসে অমানুষিক নির্যাতন। আমাদের সমাজে আজও মেয়েদের মনে করা হয় পরিবারের বুঝা। একটা মেয়ের পুতুল খেলার বয়স পেরুতে না পেরুতেই মা-বাবা বিয়ে দিতে উঠে পড়ে লেগে যান। তারা মনে করেন মেয়েদের লেখাপড়া শিখিয়ে কি লাভ? বিয়ে দিলেইতো শেষ। অথচ দার্শনিক ন্যাপলিয়ন বলেছেন “তোমরা আমাকে একজন শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের একটা শিক্ষিত জাতি উপহার দেব।”

পুরো দেশের চিত্র তুলে না ধরে সাম্প্রতিক সময়ে সিলেটে ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনার কথা যদি বলি তাহলে বুঝা যাবে নারী কতোটা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। চলতি মাসের ১৬ জুলাই সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ধর্ষিত হন ৯ম শ্রেণীতে পড়ুয়া এক কিশোরী। কিশোরী ওই মেয়েটি অসুস্থ নানীর সাথে হাসপাতালে এসেছিলো। রাতে ফাইল দেখার কথা বলে ইন্টার্ন চিকিৎসক মাক্কামে মাহমুদ মাহী ওই মেয়েটিকে একই ফ্লোরে নিজের কক্ষে ডেকে নিয়ে যান এবং ধর্ষণ করেন। পুলিশ অবশ্যই চিকিৎসককে গ্রেপ্তার করে জেল হাজতে প্রেরণ করেছে।

মৌলভীবাজারের বড়লেখা বর্ণি ইউনিয়নের ফকিরবাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রীকে (১৫) একই বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র বখাটে ফাহিম আহমদ (১৯) গত ২ বছর ধরে উত্ত্যক্ত করে আসছিলো। স্কুলে যাওয়া-আসার পথে সহযোগীদের নিয়ে ফাহিম কয়েকবার এ ছাত্রীটির শ্লীলতাহানীর চেষ্টা করে। বোনের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে ছাত্রীটির বড়ভাই আজাদ আহমদ প্রতিদিন বোনকে স্কুলে নিয়ে যান এবং ছুটির পর সঙ্গে নিয়ে বাড়ি ফিরতেন। কিন্তু এতে রক্ষা হয়নি। গত ১৪ জুলাই বোনকে স্কুলে দিয়ে ফেরার সময় বখাটে ফাহিম স্কুল গেটেই আজাদ আহমদকে ছুরিকাঘাত করে।

এ ঘটনায় ছাত্রীটি স্কুলের প্রধান শিক্ষকের নিকট বিচারপ্রার্থী হলে এ বখাটে ছাত্রের বিচার করতে তিনি ব্যর্থ জানিয়ে প্রশাসনের দ্বারস্থ হওয়ার অনুরোধ করেন। পরে ছাত্রীটির নানা আরব আলী ইউএনওর পরামর্শে বখাটে ফাহিম আহমদ ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে ওই দিনই থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। এদিকে ওই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জুবায়ের হোসেন ও উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক উপাধ্যক্ষ একেএম হেলাল উদ্দিন ঘটনাটি আপোস নিষ্পত্তির আশ্বাস দিয়ে থানা থেকে সময় চেয়ে ছাত্রী ও তার অভিভাবকদের সঙ্গে রীতিমত তামাশা ও অভিযুক্তদের আত্মগোপন করতে সহায়তা করেছেন। এখন বিষয়টি ধামাচাপা দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন।

প্রতিপক্ষতে ঘায়েল করতে অনেক সময় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে নারীদের। ২০১৭ সালের ১১ জুলাই মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় খুন হন রেহানা বেগম (১৭) নামের এক কিশোরী। পরে পুলিশি তদন্তে বেরিয়ে আসে মেয়ের প্রেমিকের সাথে বিয়ে না দিতে এবং নিজের প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতেই পরিকল্পিতভাবে রেহানাকে ঘুমন্ত অবস্থায় চুরিকাঘাত করে খুন করেন পাষণ্ড পিতা আছকর আলী।

হবিগঞ্জের বিউটিকে অপহরণ ও দুই সপ্তাহ আটকে রেখে ধর্ষণ করেছিলো স্থানীয় এক ইউপি সদস্যের বখাটে পুত্র বাবুল মিয়া। এ নিয়ে গ্রাম্য সালিসে বিচার ন্যায় পাননি বিউটির পরিবার। পরে বাবুলকে ফাঁসাতে বাবা সায়েদ আলী বিউটিকে হত্যা করা হাওরে ফেলে রাখেন।

অধিকাংশ নারী অপমানিত কিংবা ধর্ষিত হওয়ার পর নারী মানসম্মানের ভয়ে নীরবে সয়ে যান। দু-একজন আইনের কাছে বিচারপ্রার্থী হলেও অপরাধীরা প্রায়ই পার পেয়ে যায় ক্ষমতা, টাকা আর আইনের ফাঁক দিয়ে। বিচার পায় ’শত জনের মধ্যে দু-একজন। আজও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বের করতে পারলো না সোহাগী জাহান তনু হত্যার রহস্য।

একেকটি ঘটনার পর বিচারের দাবীতে কিছুদিন মিছিল, মিটিং, আন্দোলন, প্রতিবাদসভা হয়। আরেকটি ইস্যু বের হয়ে আসলেই থেমে যায় প্রতিবাদের ঝড়। ইস্যুর আড়ালেই ঢাকা পড়ে যায় আগের ইস্যুটি। কিন্তু থামে না শুধু নির্যাতিত নারীর কান্না। ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধির হার থেকে স্পষ্ট হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্রমাগত ব্যর্থতা। এ অবস্থায় নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এগিয়ে আসতে হবে। মানুষের মাঝে জাগিয়ে তুলতে হবে সামাজিক মূল্যভোগ।

লেখক : সাংবাদিক


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত মৃদুভাষণ - ২০১৪
Design & Developed BY ThemesBazar.Com