1. ahmedshuvo@gmail.com : admi2018 :
  2. mridubhashan@gmail.com : Mridubhashan .Com : Mridubhashan .Com

বুধবার, ১৩ অক্টোবর ২০২১, ০৫:০৭ অপরাহ্ন

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ সংঘাতে যে প্রভাব পড়বে বাংলাদেশে

মৃদুভাষণ ডেস্ক :: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের হামলা-পাল্টা হামলায় গোটা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধের দামামা বাজতে শুরু করেছে। মার্কিন হামলায় নিহত ইরানের সবচেয়ে ক্ষমতাধর জেনারেল এবং বিপ্লবী গার্ড বাহিনী কুদ্‌সের প্রধান কাসেম সোলাইমানির লাশ দাফনের দিনেই পাল্টা আঘাত করেছে ইরান। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির ভাষায় ‘এটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চপেটাঘাত মাত্র’। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে ওই হামলার বিষয়ে অবহিত করেছে পেন্টাগন। তবে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত হোয়াইট হাউজের তরফে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা অবশ্য বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রতিক্রিয়া দেখানোতে সময় নিলেও তারা সব দিক বিবেচনা করেই জেনারেল সোলাইমানিকে টার্গেট করে বাগদাদে অভিযান চালিয়েছিল। পাল্টা আঘাত বা ইরানের প্রতিক্রিয়ার বিষয়েও হিসাব কষেই মাঠে নেমেছে যুক্তরাষ্ট্র।

পাল্টাপাল্টি এ অবস্থা চলতে থাকলে এর ধকল কি কেবল ইরাক বা ইরানে সীমাবদ্ধ থাকবে? যে দেশকে ঘিরে প্রভাবশালী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের লড়াই সেই ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আদেল আবদুল মাহদী দুদিন আগেই বলেছেন, সোলাইমানি নিহত হওয়ার ঘটনায় গোটা অঞ্চলে যুদ্ধ বেঁধে যেতে পারে।
ঠিক এ আশংকারই প্রতিফলন ঘটে জাতিসংঘের মহাসচিব এন্তোনিও গুতেরেজের প্রতিক্রিয়ায়। তার মতে, উপসাগরে আরেকটি ‘যুদ্ধের’ ঝুঁকি নেবার মত অবস্থা বিশ্বের নেই। এ অবস্থায় সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনই যুদ্ধাবস্থা এড়াতে পারে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও’র বক্তব্যে অবশ্য ভিন্ন ইঙ্গিত রয়েছে। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ চায় না, কিন্তু আমেরিকানদের জীবন বিপন্ন হলে ওয়াশিংটন চুপ থাকবে না। এশিয়া বিশেষজ্ঞরা আরেকটু আগ বাড়িয়ে বলছেন, এখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইরানের পক্ষ-বিপক্ষ আছে। ইরানকে ঘিরে আছে মার্কিন ঘাঁটিও। চুড়ান্ত বিবেচনায় যুদ্ধ বেঁধে গেলে তা এশিয়া তথা গোটা দুনিয়ার জন্যই অস্বস্তির কারণ হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির অবণতি হলে নানা কারণে বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিতে কী ভাবছে বাগদাদস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস? বাগদাদে থাকা একজন কূটনীতিক বলছিলেন- যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধের ক্ষেত্র হয় ইরাক, তাহলে দেশটিতে থাকা ২ লাখ বাংলাদেশি নিশ্চিতভাবে নিরাপত্তার ঝুঁকিতে পড়বে। প্রথমত: একটি বড় অংশ চাকরি হারাবে। কারণ যুদ্ধে অর্থনৈতিক অবস্থা ভেঙ্গে পড়বে। বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ইরাক থেকে চলে যাবে। ফলে এর প্রভাব আমাদের কর্মীদের উপর পড়বে। দ্বিতীয়ত: বড় বড় তেল রিফাইনারি কোম্পানিগুলো হামলার শিকার হতে পারে, যেখানে প্রায় ২০ হাজারের অধিক বাংলাদেশি কমর্রত। যুদ্ধ পরিস্থিতি ভয়াবহ হলে শেল্টার সেন্টারের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশ্ববর্তী দেশে বাংলাদেশিদের নিরাপদে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। আরও ভয়াবহ হলে দেশে ফেরত পাঠাতে হবে। সে ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত ফ্লাইট থাকতে হবে। অথবা বাংলাদেশের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় তাদের ফিরিয়ে আনতে হবে।

যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব এড়াতে পারবে না বাংলাদেশ: গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস এন্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ (বিআইপিএসএস) মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি মূল্যায়ণ করে জানিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনা যদি যুদ্ধের দিকে ধাবিত হয়, তাহলে তার প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়বে। বিআইপিএসএস এর নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিষ্ঠানটির বিশ্লেষণে বলা হয়, ওই অঞ্চলে অন্তত ৬০ লাখ অভিবাসী শ্রমিক রয়েছেন। প্রথম ধাক্কাতেই তারা ঝুঁকির মুখে পড়বেন। ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা রেমিটেন্সের প্রবাহে বড় ধরণের প্রভাব পড়বে। একইসঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ প্রলম্বিত হলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে। তেলের দাম বেড়ে যাবে।

যুদ্ধের ফলে জাহাজ চলাচলের যাত্রাপথও অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে। ফলে বিশ্বজুড়ে আমদানি ও রপ্তানি ব্যহত হবে। যুদ্ধকালীন ইন্স্যুরেন্সের কারণে আন্তর্জাতিক বানিজ্যের ব্যয় বেড়ে যাবে। একইসঙ্গে আকাশপথে যাত্রাপথও দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে করে যাত্রীবাহী ও মালবাহী বিমানগুলোকে অধিক পথ অতিক্রম করতে হবে। বিআইপিএসএস বা বিপস তার মূল্যায়নে এটাও বলেছে- যুদ্ধ হলে বাংলাদেশ কুটনৈতিকভাবে তার অবস্থান নির্ধারণে জটিলতার মধ্যে পড়তে পারে। কারণ উভয় পক্ষই বাংলাদেশের বন্ধু রাষ্ট্র। পাশাপাশি ইসলামী রাষ্ট্রগুলোতে উত্তেজনা বিরাজ করলে সমগ্র মুসলিম উম্মাহের ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

অন্য বিশ্লেষকরা কী বলছেন: বাংলাদেশি কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্নেষকরাও বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থা এবং চলমান অস্থিরতার প্রভাব বাংলাদেশের মতো ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির দেশগুলোর ওপর পড়বে। তাদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রধান সামরিক ক্ষমতাধর ইরান ওই হামলার জবাব দেবে শক্তভাবেই। যুক্তরাষ্ট্রও বসে থাকবে না। সব মিলে কঠিন এক পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে যাবে গোটা অঞ্চল। কেউ কেউ বলছেন মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প তার অভিশংসন থেকে দেশটির নাগরিকদের দৃষ্টি ফেরাতে এবং ইরানের উত্থান ঠেকাতেই এ হামলা পরিচালনা করেছেন। তবে ইরান তার মিত্র রাশিয়া, চীন, তুরস্কসহ আরও কয়েকটি বড় অর্থনীতির দেশকে নিয়ে আগের চেয়ে এখন অনেক সুসংহত অবস্থানে রয়েছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শাহাব এনাম খানের মতে, মধ্যপ্রাচ্য গভীর সংকটে পড়তে যাচ্ছে। আপাত দৃষ্টিতে সংকট থেকে উত্তরণের উপায় দেখা যাচ্ছে না। ইরানের আনুষ্ঠানিক সামরিক শক্তির চেয়েও বড় শক্তি হচ্ছে লেবানন থেকে ইরাক পর্যন্ত বিস্তৃত মিলিশিয়া নেটওয়ার্ক। এটি অত্যন্ত শক্তিশালী। ফলে এটির ব্যবহার হলে অস্থিতিশীলতা প্রলম্বিত হবে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবীরের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে সংকট গভীর হলে এর বিরূপ প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়বে এটা নিশ্চিত। প্রথমত, সংকটের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ বিঘ্নিত হবে এবং বিশ্বজুড়ে তেলের দাম বাড়বে। যার প্রভাবে বাংলাদেশের মতো দেশগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ ছাড়া বড় আকারে সংঘাত শুরু হলে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হতে পারে। এতে কেবল রেমিট্যান্স প্রবাহেই বিরূপ প্রভাব পড়বে না, মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমবাজারও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সংঘাতের কারণে মুসলিম বিশ্বে একটা বিভাজন দেখা দিতে পারে। যা বাংলাদেশের জন্য সুখকর হবে না।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত নিয়ে বিবিসির আগাম বিশ্লেষণে কী বলা হয়েছিল: ইরানে মার্কিন হামলা হলে কি মধ্যপ্রাচ্যে আগুন জ্বলে উঠবে? এমন শিরোনামে প্রায় এক বছর আগে একটি বিশ্লেষণ ছেপেছিল বিবিসি। সেই সময়ে ইরানে যে আক্রমণের নির্দেশ প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প দিয়েছিলেন তা শেষ মুহূর্তে স্থগিত কারার প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণটি ছাপা হয়েছিল। সেই সময়ে কোথায় কোথায় আঘাত হানার পরিকল্পনা ছিল? ঠিক কী কারণে তা স্থগিত হলো? ইরান কি পাল্টা আঘাত করতে পারতো? পারলে সেই আঘাত কোথায় হানা হতো? তার কিছু বর্ণনাও ছিল। বিবিসির বিশ্লেষক জোনাথন মার্কাস তুলে ধরেছিলেন সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে আড়ালে থাকা কিছু তথ্য। গত দু’দিনে যে খবরা খবর আসছে তাতে বিবিসির সেই বিশ্লেষণে দৃষ্টি নিবদ্ধ হওয়ার যথেষ্ট কারণ তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষণটি ছিল এমন- ধরা যাক- ট্রাম্প শেষ মুহূর্তে মত পরিবর্তন করলেন না। তাহলে মার্কিন বাহিনীর আঘাত খুব সম্ভব হতো সীমিত। হয়তো আক্রমণ চালানো হতো ইরানের কিছু রাডার বা ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনার ওপর, এবং তার সাথে যোগ হতো কিছু কূটনৈতিক সতর্কবাণী। তবে, ভুলে যাবেন না যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এ কথাও বলছেন যে ‘ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা এখনও আছে।’

ইরানি শাসকগোষ্ঠীকে উৎখাত করতে পূর্ণমাত্রার মার্কিন স্থল অভিযান ঘটার কোন সম্ভাবনা নেই জানিয়ে এক বছর আগে বিবিসি বিশ্লেষক বলেছিলেন- যদিও হোয়াইট হাউসের কোন কোন লোক তেমন কিছু একটা চায়। এর কারণ- সামরিক এবং রাজনৈতিক দিক থেকে ইরান অনেক বেশি জটিল এক চ্যালেঞ্জ। তারা সাদ্দাম হোসেনের ইরাক নয়।

বিশ্লেষণে বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র আঘাত করলে নিশ্চিতভাবে ইরান পাল্টা আঘাত করবে। হয়ত কোন মার্কিন জাহাজ বা বিমান আক্রান্ত হবে। এ ছাড়া ইরান উপসাগরে জাহাজ বা তেলবাহী ট্যাংকারের চলাচল বিঘ্নিত করতে মাইন, ছোট আকারের নৌকা, বা সাবমেরিন দিয়ে আক্রমণ চালাতে পারে।

বিবিসির বিশ্লেষণে এটাও বলা হয়েছিল- সেই সময়ে আমেরিকানদের যে ড্রোন ইরান ভূপাতিত করেছে- তা অত্যন্ত উচ্চ প্রযুক্তির এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য আহরণের যত উন্নত ব্যবস্থাই থাকুক না কেন – তাদের দুর্বলতাও আছে। ইরান হয়তো ভাবছে, তারা যদি কয়েকটা মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দিতে পারে – তাহলে মি. ট্রাম্প হয়তো ভাববেন, এত চড়া মূল্যে যুদ্ধ চালানোর দরকার নেই। যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা আঘাত হানলে কী হবে? সেই প্রশ্ন তুলে বিবিসি বলেছিল- মনে রাখতে হবে – এ যুদ্ধ হবে অসম, অর্থাৎ একটি পক্ষ খুবই শক্তিশালী, অন্য পক্ষ অপেক্ষাকৃত দুর্বল।

ইরানের হামলার জবাবে আমেরিকানরা ইরানি নৌ-স্থাপনা, বিমানঘাঁটির ওপর আঘাত হানতে পারে – বিমান বা ক্রুজ মিসাইল দিয়ে তারা হয়তো ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করতে পারে। সামরিক বাহিনীর ব্যাপক ক্ষতিসাধন করতে পারে। কিন্তু ইরান যা করতে পারে তা হলো আমেরিকার এমন কিছু ক্ষতিসাধন করা যা আমেরিকায় জনমতকে এ যুদ্ধের বিরুদ্ধে ঘুরিয়ে দিতে পারে।

সংঘাত পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে গেলে কী হবে? সেই প্রশ্নে তাদের বিশ্লেষণ ছিল- ইরান এই সংঘাতকে ছড়িয়ে দিতে পারে। তার প্রক্সি দেশ যেমন ইরাক, সিরিয়া বা অন্যদেরকে আহ্বান জানাতে পারে মার্কিন লক্ষ্যবস্তুর ওপর আঘাত হানতে। এমনকি এটাও হতে পারে যে- হিজবুল্লাহ বা সিরিয়ায় থাকা ইরানি সৈন্যদের সমন্বয়ে ইসরায়েলের ওপর রকেট হামলা হতে পারে।


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত মৃদুভাষণ - ২০১৪
Design & Developed BY ThemesBazar.Com