1. ahmedshuvo@gmail.com : admi2018 :
  2. mridubhashan@gmail.com : Mridubhashan .Com : Mridubhashan .Com

সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৩:১৭ পূর্বাহ্ন

ইতালি প্রবাসীর ঘরে ফেরা ও লকডাউন শুরুর গল্প

মৃদুভাষণ ডেস্ক :: ৭ মার্চ ২০২০। তখনো বাংলাদেশে করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীর সন্ধান মেলেনি। ওই দিন বাংলাদেশে আসেন শিবচর পৌর এলাকার এক ইতালি প্রবাসী।

বাংলাদেশে করোনাভাইরাস আক্রান্তের কোনো সংবাদ পাওয়া না গেলেও ইতালিতে ওই সময় মহামারী চলছে। বাংলাদেশে পৌঁছার পর থেকেই তিনি জ্বর, কাশি ও গলা ব্যথা অনুভব করেন।

চিকিৎসা নিতে প্রথমেই শরণাপন্ন হন স্থানীয় সরকারি হাসপাতালের এক চিকিৎসকের। অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় ওই চিকিৎসক তাকে ঢাকায় চিকিৎসা নেয়ার পরামর্শ দেন।

ঢাকা মেডিকেলের চিকিৎসকরা তার ইতিহাস ও উপসর্গ বিশ্লেষণ করে কোভিড-১৯ আক্রান্ত বলে সন্দেহ করেন। পরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আইইডিসিআর-এ পরীক্ষা করলে তিনি কোভিড-১৯ পজিটিভ হন। এরপর আইইডিসিআরের প্রতিনিধি দল মাঠে নেমে ওই করোনা রোগীর সংস্পর্শে আসা মানুষের তালিকা প্রস্তুত করে ব্যবস্থা নেয়।

আইইডিসিআরের পরীক্ষায় একে একে কোভিড-১৯ পজিটিভ হয় তার স্ত্রী, ছয় বছর ও দুই বছর বয়সী দুই শিশু সন্তান, বাবা, শ্বশুর-শাশুড়ি, শ্যালকের স্ত্রী, চিকিৎসক ও এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আইইডিসিআরের পরামর্শ অনুযায়ী আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসা মানুষকে হোম কোয়ারেন্টিনে নেয়া হয়।

হোম কোয়ারেন্টিনে নেয়া হয় তার ছয় বছরের মেয়ের স্কুলের ১৯ সহপাঠীকেও। ইতালি প্রবাসীর মেয়ে গত ১১ মার্চ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্লাসে যায়। ওই ক্লাসে সেদিন ১৯ শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিল।

আইইডিসিআর যেদিন ঢাকায় সংবাদ সম্মেলনে জেলা ওয়ারী করোনা আক্রান্ত রোগীর তালিকা প্রকাশ করেন সেদিন ঢাকা জেলার পরেই ছিল মাদারীপুরের অবস্থান। এর মধ্যে জেলার তালিকায় শিবচর উপজেলায় ৯ জন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সংবাদ সম্মেলনে মাদারীপুর, ফরিদপুর ও শিবচর প্রয়োজনে লকডাউন করা কথা বলেন।

গত ১২ মার্চ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে চিহ্নিত এলাকা গুলো জনসমাগম এড়াতে শিবচর উপজেলা প্রশাসন কিছু জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। প্রথম অবস্থায় নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস পত্রের দোকান-পাট খোলা রেখে এবং ধরনের দোকানপাট বন্ধ এবং গণপরিবহন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেন।

কিন্তু তার কিছুক্ষণ পরই প্রশাসন আবার সেই সিদ্ধান্ত কিছুটা শিথিল করে। তবে থেমে থাকেনি দেশের প্রচার মাধ্যম। উপজেলা প্রশাসনের ওই সিদ্ধান্তের পরপরই গণমাধ্যমও মিডিয়ায় প্রচারিত হয় লকডাউন।

পরের দিন ১৩ মার্চ মাদারীপুর জেলা প্রশাসক মো. ওয়াহিদুল ইসলামের সভাপতিত্বে শিবচরে আবার জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় মাদারীপুর পুলিশ সুপার, সিভিল সার্জন, আইইডিসিআরের প্রতিনিধি দল উপস্থিত ছিলেন।

এছাড়া ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নূর-ই-আলম মিনার নেতৃত্বে জেলা পুলিশও সভা করে। সেখান থেকে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত পৌর এলাকার ২ এবং ৩ নম্বর ওয়ার্ড, দক্ষিণ বহেরাতলা ইউনিয়নের একটি গ্রাম ও পাঁচ্চর ইউনিয়নের হাজীপুর গ্রামের কিছু স্থান। চারটি এলাকাকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

সেখানে আগের দিনের সিদ্ধান্ত আরও কঠিনভাবে প্রয়োগ করার জন্য জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের ব্যাপারে একমত হন। আর শিবচরই দেশের মধ্যে প্রথম লকডাউন করা এলাকা।

পরের দিন থেকে চিহ্নিত এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করে জন-বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়। জনসমাগম এড়িয়ে চলতে কঠোর নির্দেশ দেয় জেলা প্রশাসন। কিন্তু খাবার সংকটের কথা চিন্তা করে মাদারীপুর-১ (শিবচর) আসনের সংসদ সদস্য জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরীর নির্দেশে হোম কোয়ারেন্টিনে (ঘরবন্দি) এলাকার মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় খাবার পৌঁছে দেন স্থানীয় প্রশাসন।

পরের দিন থেকেই উপজেলার ১৯ ইউনিয়ন ও শিবচর পৌর এলাকার সর্বত্র হোম কোয়ারেন্টিনে থাকা প্রবাসী ও নিম্নআয়ের মানুষদের কাছে খাবার পৌঁছানো শুরু করেন। এ পর্যন্ত প্রবাসী ও স্বল্প আয়ের ৮০০ পরিবারের মধ্যে ৮২ মেট্রিক টন চাউল বরাদ্দ দেয়া হয়।

এছাড়া ডাল, পেঁয়াজ, তেল, আলু, পিয়াজ, ওষুধসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য বিতরণ করা হয়। এ ছাড়াও ৫৭৫ জন মৎস্যজীবী পরিবারকে ৮০ কেজি করে চাল বিতরণ এবং দরিদ্র অসহায় ২ হাজার ১৯৬ পরিবারের মধ্যে ভিজিডির ৩০ কেজি করে চাল প্রদান করা হয়। উপজেলার নিম্ন আয়ের সকল শ্রেণি পেশার মানুষকে এই সাহায্যের আওতায় নেয়া হয়েছে।

এছাড়া প্রয়োজন অনুসারে কাউকে আইসোলেশনে এবং আক্রান্তদের সরকার নির্ধারিত চিকিৎসা কেন্দ্রে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। এরমধ্যে গত বুধবার ২৫মার্চ ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার বাবা মারা যান।

গত ৭ মার্চ শিবচরে এসে এ পর্যন্ত এই উপজেলায় একজন প্রবাসীর পরিবারের ৮ জনসহ নয়জন করোনা রোগী সংক্রমিত হয়েছে। এরমধ্যে আক্রান্ত প্রবাসীর বাবা মারা গেছেন। কিন্তু ওই প্রবাসীর অবাধ চলা-ফেরার কারণে আত্মীয়-স্বজন ছাড়াও স্থানীয় কমিউনিটির মধ্যে কতটুকু সংক্রমিত হয়েছে তা নিয়ে রয়েছে ব্যাপক সন্দেহ।

প্রবাসী করোনাভাইরাস বহন করে ভ্যানে চড়ে শিবচর হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা-যাওয়া করেন। ওই হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ না হলে সেখান থেকে আবার লোকাল পরিবহনে চড়েই প্রবাসী ঢাকায় যান। ঢাকায় গিয়ে এক আত্মীয়ের বাসায় স্ত্রী ও মেয়েসহ অবস্থান করেন এবং ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসা নেন। সেখানেও চিকিৎসকসহ কতজন সংক্রমিত হয়েছে আসলে তা সঠিক করে বলা মুশকিল।

তারপরও আশার বানী হল- আইইডিসিআর গত দুইদিনে শিবচরে ১৬ জনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। কিন্তু তাদের করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়নি।

করোনা সংক্রমণের আতংকে সুনসান নীরবতা ও নিস্তব্ধ হয়ে পড়েছে গোটা শিবচর। শুক্রবার এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে শিবচরের চিহ্নিত এলাকার ওই ৭০ হাজার মানুষই হোম কোয়ারেন্টিনে। শুধু তারাই নয়। এলাকার ৭ লাখ মানুষই স্বেচ্ছায় ঘরবন্দি হয়ে পড়েছেন।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শশাংক চন্দ্র ঘোষ জানান, এই উপজেলায় একজন প্রবাসীর পরিবারের আটজনসহ ৯ জন করোনাভাইরাস রোগী সংক্রমিত হয়েছে। এর মধ্যে আক্রান্ত প্রবাসীর বাবা মারা গেছেন বলে শুনেছি। আইইডিসিআর গত দুইদিনে ১৬ জনের নমুনা সংগ্রহ করলেও সবাই করোনা নেগেটিভ বলে জানাতে পেরেছি। উপজেলাটি এখন উন্নতির দিকে বলে তিনি দাবী করেন।

শিবচর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আসাদুজ্জামান জানান, প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ ও পুলিশ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ মিডিয়াকর্মীসহ সবাই সমন্বিত প্রচেষ্টায় করোনা ঝুঁকি এড়াতে একযোগে কাজ করছি। মূলত উপজেলাটি সঠিক সময়ে কনটেইমেন্ট ঘোষণা করার পর চিফ হুইপ ওষুধ ও খাবার বিতরণ কর্মসূচি চালু করা স্বল্প আয়ের মানুষ ও প্রবাসীরা আশ্বস্থ হয়। তাই মানুষ বিনা প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হচ্ছে না। মানুষও এখন অনেক সচেতন।

শিবচরের পৌর মেয়র আওলাদ হোসেন খান জানান, ইতালি প্রবাসী শিবচরে এসে আত্মীয় স্বজনের বাড়ি বেড়াতে যান। সেখানে তার সংস্পর্শে স্ত্রী, ছয় ও দুইবছর বয়সী দুই শিশু সন্তান, বাবা, শ্বশুর-শাশুড়ি, শ্যালকের স্ত্রী, চিকিৎসক ও এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু তার দ্বারা আক্রান্ত হন। ওই সব আক্রান্তদের মধ্যে বুধবার ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তার বাবা।

তিনি বলেন, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরীর নির্দেশে উপজেলার সর্বত্র হোম কোয়ারেন্টিনে থাকা প্রবাসী ও স্বল্প আয়ের মানুষদের বাড়ি বাড়ি প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছি।

মাদারীপুর সিভিল সার্জন ডা. মো. শফিকুল ইসলাম জানান, জনৈক ইতালি প্রবাসী করোনাভাইরাসের উপসর্গ নিয়ে প্রথমে শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডাক্তার দেখান। পরে ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসা নেন। সেখান থেকে আইইডিসিআরের পরীক্ষা নিরীক্ষায় তিনিই প্রথম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী বলে শনাক্ত হন।

মাদারীপুর জেলা প্রশাসক মো. ওয়াহিদুল ইসলাম বলেন, প্রবাসী অধ্যুষিত মাদারীপুর জেলা। এর পর আবার শিবচরের অনেক মানুষই ইতালিসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশে বাস করেন।

জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী করোনা সংক্রমণের হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করতে এলাকার মানুষকে ধৈর্য ধরে ঘরে থাকার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, হোম কোয়ারেন্টিনে (ঘরবন্দি) এলাকার মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় খাবার পৌঁছে দেয়ার জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছি। উপজেলার ১৯ ইউনিয়ন ও শিবচর পৌর এলাকার সর্বত্র হোম কোয়ারেন্টিনে থাকা প্রবাসী ও নিম্ন আয়ের মানুষদের কাছে খাবার পৌঁছে দিব। মানুষ কষ্ট করে ঘরে থাকলেও তাদের না খেয়ে থাকতে হবে না।


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত মৃদুভাষণ - ২০১৪
Design & Developed BY ThemesBazar.Com