1. ahmedshuvo@gmail.com : admi2018 :
  2. mridubhashan@gmail.com : Mridubhashan .Com : Mridubhashan .Com

বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৭:১৮ অপরাহ্ন

করোনার প্রাদুর্ভাব ও আমাদের মনোজগতের পরিবর্তন

এম এ হাসান :: করোনা বা কোভিট-১৯ বর্তমান সময়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়া একটি ভাইরাসের নাম। গত বছরের ডিসেম্বর মাসে এটি চীনের হুবেই প্রদেশের উহানে এক ব্যক্তির শরীরে ধরা পড়ে। পরবর্তীতে এটি এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির দেহে ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় তিন মাস করোনার সাথে যুদ্ধ করে চীন এখন কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে। সম্পূর্ণ অপরিচিত, অজানা একটি ভাইরাসের সাথে চীনের মত সমৃদ্ধশালী একটা দেশের পেরে উঠতে অনেক বেগ পেতে হয়েছে।

ইতোমধ্যে এ ভাইরাস সম্পর্কে যা জানা গেছে তা হলো- এটি খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে এক জনের থেকে অন্য জনের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এই ভাইরাসের বৈশিষ্ট্য, উপসর্গ, চরিত্র, আচরণ সম্পূর্ণ অজানা থাকার কারণে প্রথমে চীন এখন সমগ্র পৃথিবীর চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা চরম দুশ্চিন্তার মধ্যে রয়েছে। যদিও তারা প্রতিষেধক তৈরির জন্য নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। ভাইরাসটি মানুষের শ্বাসনালীতে প্রদাহ সৃষ্টি করে শ্বাসনালীর কার্যক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। যার ফলে মানুষ শ্বাস প্রশ্বাসের অভাবে মারা যাচ্ছে।

যদিও এখন পর্যন্ত করোনা ভাইরাসের পরিপূর্ণ চিকিৎসা বা ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয়নি তথাপি বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করে যাচ্ছেন। সারা বিশ্ব আজ বিজ্ঞানীদের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। ভ্যাকসিন আবিষ্কার হতে ১৬-১৮ মাস আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। পরীক্ষা -নিরীক্ষা করে বাজারে আসতে আরো বেশি সময় লাগতে পারে।

এখন পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন ভাবে অনেক ঔষধের কথা বলা হচ্ছে কিন্তু এর কোনোটিই কোভিট-১৯ এর কার্যকরী চিকিৎসা নয়। চীনের উহান শহর থেকে পৃথিবীর প্রায় দুইশত দেশ ও অঞ্চলে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়েছে। সর্বশেষ তথ্যমতে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ এ ভাইরাস সংক্রমিত হয়েছে। মারা গেছেন প্রায় ৯০ হাজার লোক।

প্রতিনিয়ত এ সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সুস্থ হওয়া লোকের সংখ্যা নিতান্তই কম। এই মহামারির শেষ কোথায় তা কেউ জানে না।

পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো বিশেষ করে ইউরোপের দেশ সমূহ করোনার করাল গ্রাসে বিপর্যস্ত। ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, জার্মানিসহ ইউরোপের অধিকাংশ দেশেই বর্তমানে এটা মহামারি আকার ধারণ করেছে। বর্তমান বিশ্বের পরাশক্তি আমেরিকা আজ করোনার কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করেছে। আক্রান্তের দিক দিয়ে আমেরিকাই হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত।

এশিয়ার প্রতিটা দেশেও ভাইরাসটির প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশও প্রতিনিয়ত আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে।

পৃথিবীর সমস্ত অর্জন আজ অদৃশ্য এক শত্রুর কাছে অসহায় হয়ে পড়ছে। মানুষের সমস্ত জ্ঞান আজ নিরুপায়। সবাই আজ উপরের দিকে তাকিয়ে।
একমাত্র আল্লাহ পাকই এই মহামারি থেকে পরিত্রাণ দিতে পারেন। ইতালির প্রধানমন্ত্রী অসহায়ের মতো তাই বলেই ফেলেছেন, ‘আমাদের উপরের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কোন উপায় নেই। আমাদের সমস্ত চেষ্টা আজ ব্যর্থ।’

কোভিট-১৯ বা করোনা ভাইরাসের উৎস জানা থাকলেও এটা মানুষের তৈরি কি না তা নিয়ে নানা কৌতূহল রয়েছে। প্রকৃতিগত ভাবেই এসেছে তা আজও পরিষ্কার নয়। কেউ বলছেন বাদুড় থেকে বা অন্যান্য প্রাণী থেকে এর উৎপত্তি।

তাদের ধারনা চীনের লোক প্রচুর পরিমাণ বন্যপ্রাণী খেয়ে থাকে তাই এসব প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে এসেছে।

বর্তমান সময়ে এটা নিয়ে স্নায়ু যুদ্ধের মত এক ধরনের অবস্থা বিরাজ করছে। আমেরিকা পন্থীরা মনে করছে, চীনের উহানের একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণাগার থেকে ছড়িয়ে পড়ছে। এই গবেষণাগারে চীন অনেক ধরনের ভাইরাস নিয়ে কাজ করে।

আবার চীন পন্থীরা বলছে, এটা আমেরিকারই তৈরি একটি ভাইরাস। অবশ্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা চিকিৎসা বিজ্ঞান এখনো এরকম কিছু বলছে না। সুনিশ্চিত করে এখনো কেউ কিছু বলতে পারছে না।

মূলত এখনো এটি প্রকৃতিগত ভাবে ছড়িয়ে পড়া একটি ভাইরাস বলেই মনে করা হচ্ছে। চিকিৎসা বিজ্ঞান সুনিশ্চিত করে কিছু না বলা পর্যন্ত আমাদের এটাই মেনে নিতে হবে।

এরকম মহামারি পৃথিবী এর আগেও বহুবার দেখেছে। ইতিহাস বলছে বিগত কয়েক দশকের এই কুড়ি সালেই পৃথিবীতে মহামারি নেমে এসেছিল। ১৬২০,১৭২০,১৮২০ এমনকি ১৯২০ সালেও পৃথিবীতে বিপর্যয় নেমে এসেছিল। প্রত্যেক বারেই লাখ লাখ মানুষ বিভিন্ন ফ্লুতে মৃত্যু বরণ করেছিল। এবার কাকতালীয় ভাবে ২০২০ সালেও পৃথিবী করোনার মহামারি দেখছে।

কোভিট-১৯ কিভাবে এসেছে, কারা এটা তৈরি করেছে এসবের মধ্যে একটা বিষয় লক্ষণীয়, আর তা হলো- গোটা পৃথিবীকে এই ভাইরাস কি শিক্ষা দিচ্ছে। মানবজাতির জীবনাচরণে কি পরিবর্তন আনছে। আমরা ইতোমধ্যে দেখেছি ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ব্যস্ত পৃথিবীকে নিমিষেই স্থবির করে দিয়েছে। প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর পৃথিবীটা আজ এক মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। গতিশীল এজগত আজ থেমে গেছে। অস্ত্রের ঝনঝনানি, অর্থনৈতিক শক্তির দাপট, সামরিক বাহাদুরি সবই আজ তুচ্ছ হয়ে গেছে।

প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে লক্ষ লক্ষ লোক মারা গেছে। পৃথিবীতে প্রতিনিয়ত মানুষের সৃষ্টি যুদ্ধ বিগ্রহে অসংখ্য লোক মরছে। দুর্বলের উপর সবলের চাপিয়ে দেয়া অবরোধ, লকডাউন আর কারফিউয়ে গোটা পৃথিবীতে বৈষম্যের রাজত্ব সৃষ্টি হয়েছে।

সুপার শক্তি গুলো প্রতিনিয়ত নিজেদের তৈরি পারমানবিক অস্ত্র, হাইপারসনিক মিসাইল, যুদ্ধজাহাজ, এয়ারক্রাফট দিয়ে দুর্বলের উপর মাতব্বরি করছে।

অন্যায়ভাবে প্রতিদিন লোক মারছে। এসবই ছিল দৃশ্যমান। মানুষের তৈরি অস্ত্র, গোলা বারুদ, কামান, ক্ষেপণাস্ত্র সবই দৃশ্যমান। শত্রুও দৃশ্যমান। মিত্রও দৃশ্যমান।

কিন্তু কি আজব লীলা সারা পৃথিবী আজ এক অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে লড়ছে। অদৃশ্য শত্রুর ভয়ে আজ সবাই লকডাউনে,কোয়ারেন্টাইনে, আইসোলেশনে।

এই শত্রু সবল-দুর্বল দেখে আক্রমণ করছে না। কার কতটা যুদ্ধ বিমান আছে কার নেই। কার সামরিক শক্তি বেশি, কার কম এসব দেখে আসছে না। এই অদৃশ্য শত্রুর কাছে আজ সারা দুনিয়া ধরাশায়ী।

ইউরোপ- আমেরিকায় আজ হাজার হাজার মানুষ মরছে অথচ কোনো হুংকার নেই! ভাবা যায়!!

কোনো শত্রু রাষ্ট্রের আক্রমণে একটা লোক মারা গেলে আমেরিকা কি করতো! অত্যাধুনিক সব সমরাস্ত্র ব্যবহার করে তছনছ করে দিত সব সভ্যতাকে,মানবতাকে। কিন্তু আজ নিশ্চুপ।

এটা এমন এক শত্রু যার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যাচ্ছে না, কোন মিসাইল, সেনাবাহিনীকে অর্ডার করা যাচ্ছে না। পৃথিবীর জন্য কি অদ্ভুত না ব্যাপারটা!

মানুষ টাকা আর বিত্ত বিভবের পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে ব্যস্ত হয়ে গিয়েছে। সন্তান পিতা -মাতাকে। মাতা -পিতা সন্তানকে। স্বামী- স্ত্রীকে, স্ত্রী -স্বামীকে দেয়ার মত সময় খুব কমই ছিল।

পারিবারিক জীবনে এ বিষয়টা নিয়ে যারা অসুখী ছিল তাদের জন্য কোভিট-১৯ পরম শুভাকাঙ্ক্ষী বলা যায়।

করোনা আজ সবার ব্যস্ততার ঘরে তালা লাগিয়ে দিয়েছে। মানুষ বৈধ অবৈধ বাচ বিচার না করে সব নিজের করে নেয়ার নেশায় মত্ত হয়ে গিয়েছিল।

অথচ কোভিট-১৯ আজ মানুষের মনোজগতের পরিবর্তন এনে দিল। মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনটা ইতিবাচক।

মানুষের ভেতরে মৃত্যুর ভয় এসেছে। মানুষ আল্লাহমূখী হয়েছে। সবাই নিজ নিজ ধর্মানুসারে উপাসনায় ব্যস্ত হয়েছে। সবাই সম্পদ ব্যয় করছে। দান সদকা করছে।

প্রকৃতি আজ অপরূপ সাজে সাজছে। নির্মল হচ্ছে পরিবেশ।

আজ সিগারেট খাওয়া ছেলেটাও সিগারেটের টাকা জমিয়ে পাশের বাড়ির ক্ষুধার্ত লোকটার মুখে আহার দিচ্ছে। নেশাখোর লোকটাও মৃত্যু ভয়ে ফল খাচ্ছে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য। উশৃঙ্খল জীবন যাপন করা মানুষটাও আজ সুশৃঙ্খল জীবন যাপনে ব্যস্ত।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যুগে যুগে সীমালঙ্ঘন করা জাতিগুলোকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে তাদের কর্মের জন্য।

করোনা একদিন চলে যাবে। পৃথিবী আবার ফিরে পাবে তার প্রাণচাঞ্চল্য। আমরা যদি এই সময়ে অর্জিত জ্ঞান, সচেতনতা ও শিক্ষাকে কাজে লাগাই, তাহলে নতুন পৃথিবী হবে করোনা পূর্ব পৃথিবীর চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও মানবিক।

যে পৃথিবীতে দেশে দেশে থাকবে প্রতিযোগিতা তবে পরিবর্তন হবে চিন্তার। একজন সামরিক অফিসারের চেয়ে একজন ডাক্তার তৈরিতে গুরুত্ব দেয়া হবে বেশি।

একটা মিসাইল তৈরির চেয়ে একটা মেডিসিন তৈরিতে বেশি ব্যয় হবে অর্থ। একটা অস্ত্রাগার নির্মাণের চেয়ে মেডিক্যাল পাবে অগ্রাধিকার। দখল আর আধিপত্য হ্রাস পাবে, সবাই মিলে হবে একাকার।

লেখক : সাবেক শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান
ইচ্ছেঘুড়ি ফাউন্ডেশন।


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত মৃদুভাষণ - ২০১৪
Design & Developed BY ThemesBazar.Com