1. ahmedshuvo@gmail.com : admi2018 :
  2. mridubhashan@gmail.com : Mridubhashan .Com : Mridubhashan .Com

রবিবার, ০৫ জুলাই ২০২০, ১২:৫৮ পূর্বাহ্ন

আম্পানের ১৫ ঘণ্টা তাণ্ডব: ব্যাপক ক্ষতি ২৬ জেলায়

মৃদুভাষণ ডেস্ক :: অতিপ্রবল’ ঘূর্ণিঝড় আম্পান (প্রকৃত উচ্চারণ উম-পুন) বৃষ্টি ঝরিয়ে গুরুত্বহীন হয়ে গেছে। বুধবার রাতে বাংলাদেশ ও ভারতের উপকূলে আঘাত হানার পর এটি ১৫ ঘণ্টা ধরে তাণ্ডব চালায় বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।

এই দীর্ঘ সময়ে এটির শক্তি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। পরে সকাল ৯টায় ঘূর্ণিঝড়টি পরিণত হয় গভীর স্থল নিম্নচাপে। ২০০৭ সালের সিডরের পর সবচেয়ে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ছিল আম্পান।

বাংলাদেশে এটির সর্বোচ্চ গতি রেকর্ড করা হয় ১৫১ কিলোমিটার সাতক্ষীরায়। ঘূর্ণিঝড়ের কারণে উপকূলীয় বিভিন্ন জেলায় ১০-১২ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গের চেয়েও বাংলাদেশে এর দাপট ছিল বেশি। সুন্দরবনের কারণে এ যাত্রায় আরও বড় ক্ষতি থেকে বেঁচে গেছে বাংলাদেশ-ভারত উভয় দেশ।

আম্পান চলে গেলেও রেখে গেছে ভয়াবহ ক্ষতচিহ্ন। অন্তত ৪০ জেলায় এর কমবেশি প্রভাব পড়ে। তবে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে অন্তত ২৬ জেলায়। এসব জেলার মধ্যে আবার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও পটুয়াখালীর জনপদে।

প্রাথমিকভাবে সরকারি হিসাবে এক হাজার ১০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। ফসল নষ্ট হয়েছে ২ লাখ হেক্টর জমির। বিভিন্ন স্থানে ২ শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আংশিক বা পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৭ জেলায় অন্তত ১২ জন মারা গেছে। যদিও সরকারিভাবে সর্বোচ্চ ১১ জন স্বীকার করা হয়েছে। আর আহত হয়েছেন অর্ধশত মানুষ। ঝড়ের সময় দেশের অন্তত ৬০ শতাংশ বা ১ কোটি ২০ লাখ গ্রাহক বিদ্যুৎহীন ছিলেন। বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে পড়ায় ঝড় চলে যাওয়ার ৬-৭ ঘণ্টা পরও সংযোগ দেয়া যায়নি।

রাত ১০টায় এ রিপোর্ট লেখাকালেও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো থেকে একে একে আসতে থাকে ক্ষয়ক্ষতির খবর। এ নিয়ে কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান আলাদা ব্রিফিং করেছেন।

এ সময় তারা ক্ষয়ক্ষতির চিত্র তুলে ধরেন। এছাড়া সারা দেশ থেকে যুগান্তর প্রতিনিধিরা ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরে প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন।

তাদের প্রতিবেদনে অন্তত ৩০ হাজার ঘরবাড়ি, হাজার হাজার গাছপালা ও কয়েক হাজার কিলোমিটার বাঁধ ও সড়কপথ ভেঙে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

রাস্তা ভেঙে যাওয়ায় ও এতে ভাঙাগাছ পড়ে থাকায় দেশের বিভিন্ন স্থানে বন্ধ হয়ে যায় সড়ক যোগাযোগ। কোথাও বাঁধ ভেঙে আবার কোথাও বাঁধ উপচে ঘূর্ণিঝড়ের বায়ুতাড়িত জোয়ারের পানি ঢুকে পড়ে লোকালয়ে।

ফলে গ্রামের পর গ্রাম জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হয়। এতে ভেসে গেছে পুকুরের ও ঘেরের মাছ। এর মধ্যে কেবল সাতক্ষীরায়ই ৪ হাজার মাছের ঘের ভেসে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

মাছের ঘের ভেসে গেছে পটুয়াখালী, বরগুনা, বাগেরহাট, হাতিয়া আরও কয়েকটি জেলায়। পাশাপাশি বিভিন্ন জেলায় ভেসে গেছে আউশের বীজতলা, মুগডাল, মরিচ, আলু, তরমুজ, বাঙ্গিসহ বিভিন্ন ধরনের রবিশস্যের মাঠ।

খামারের মুরগি মরে গেছে। নষ্ট হয়েছে শাকসবজির ক্ষেত। রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ঝিনাইদহ, যশোরসহ দেশের স্থান থেকে কয়েকশ’ মন কাঁচা আম ও লিচু ঝরে পড়ার খবর পাওয়া গেছে। ভেঙে পড়েছে পানের বরজ ও কলাবাগান। ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তদের বৃহস্পতিবার থেকেই ঘর নির্মাণ, অর্থ ও ত্রাণ সহায়তা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এদিকে বিকালে এক অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমান জানান, চারটি মন্ত্রণালয়ের দেয়া প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী ঘূর্ণিঝড় আম্পানে এক হাজার ১০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

তিনি বলেন, ঘূর্ণিঝড় আম্পান ২৬টি জেলায় আঘাত হেনেছে। চূড়ান্তভাবে কত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে সেই বিষয়ে মাঠ পর্যায়ের জেলা প্রশাসকদের কাছ থেকে ডি-ফরমে তথ্য আসবে। প্রায় ৭ দিন সময় লাগবে। এরপর এটা জানাতে পারব।

তিনি বলেন, ‘স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের রিপোর্ট অনুযায়ী জানতে পেরেছি, প্রায় এক হাজার ১০০ কিলোমিটার রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২৬টি জেলার মধ্যে এই রাস্তা রয়েছে।

২০০টি ব্রিজ-কালভার্ট এবং ২৩৩টি স্থানীয় সরকার কার্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এগুলো বেশির ভাগ বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, খুলনা এলাকায়। এছাড়া অনেকগুলো টিউবওয়েলের ক্ষতি হয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী বরিশাল ও খুলনা বিভাগে পাট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া আম, লিচু, মুগডালের ক্ষতি হয়েছে। প্রায় ১৫০ কোটি টাকার আমের ক্ষতি হয়েছে। সাতক্ষীরা, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমের ক্ষতি হয়েছে। ধানের তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি।’

ডা. এনাম বলেন, ‘আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, আমরা জেলা প্রশাসকদের নির্দেশনা দেব যে আমগুলোর ক্ষতি হয়েছে সেগুলো ত্রাণের টাকায় কিনে যাদের খাদ্য সহায়তা দিচ্ছি তাদের মধ্যে এগুলো বিতরণ করতে হবে। এতে আমচাষিরা লাভবান হবেন, আমগুলোর সদ্ব্যবহার হবে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের ১৫০ কিলোমিটার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৮৪টি জায়গায় বাঁধের ফাটল ধরেছে বা ভেঙেছে। সেগুলোর জন্য তাদের ২৫০ থেকে ৩০০ কোটি টাকা বাজেট ধরা হয়েছে। আগামীকাল থেকে এই বাঁধগুলোর সংস্কার কাজ চলবে।’

ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ জানিয়েছে, বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকায় অনেক জায়গায় তাদের নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন আছে। বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করবে।

এনামুর রহমান বলেন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এবার যেহেতু আমরা পশুদের আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে যেতে পেরেছিলাম এজন্য গবাদিপশুর খুব বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।

কিন্তু মৎস্য চাষের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, বরগুনা, পটুয়াখালীতে প্রায় এক লাখ ৮০ হাজার ৫০০ চিংড়ির ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এক্ষেত্রে ৩২৫ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। প্রাণিসম্পদের ক্ষতি হয়েছে এক কোটি ৪০ লাখ টাকা। শিক্ষা খাতের খুব বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। পূর্ত মন্ত্রণালয়ের সামান্য ক্ষতি হয়েছে, খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কোনো ক্ষতি হয়নি।

১৪ মে লঘুচাপ থেকে নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়েছিল দক্ষিণ বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগরে। সেটিই পরে ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়ে ‘আম্পান’ নাম ধারণ করে। শক্তি সঞ্চয় করে একটি পর্যায়ে এটি ‘সুপার ঘূর্ণিঝড়ে’ পরিণত হয়। সর্বোচ্চ ২৭০ কিলোমিটার পর্যন্ত উঠেছিল এর বাতাসের গতি। আর উপকূলের দিকে এর অগ্রগতি উঠেছিল সর্বোচ্চ ২৯ কিলোমিটার।

পরে শক্তি কিছুটা হারিয়ে ‘অতিপ্রবল’ ঘূর্ণিঝড়রূপে আঘাত হানে। প্রায় সাড়ে ১৩শ’ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয় এটি। বুধবার বিকাল ৪টার দিকে এটি ভারতের সাগর দ্বীপের পূর্বপাশ দিয়ে সুন্দরবন সংলগ্ন পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের উপকূল অতিক্রম শুরু করে। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার পর এটি সুন্দরবনসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন অংশে ঢুকে পড়ে।

একসঙ্গে সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও পটুয়াখালীতে আঘাত হানে। তবে বড় ধরনের তাণ্ডব চালায় সাতক্ষীরায়। সেখানে রাত ৮টা ৩৩ মিনিটে ১৩৩ কিলোমিটার আর ৯ থেকে সোয়া ৯টায় ১৫১ কিলোমিটার বাতাসের গতি রেকর্ড করেছে বাংলাদেশের আবহাওয়া বিভাগ (বিএমডি)।

সেখান থেকে ভয়ংকর রূপ নিয়ে আম্পান অগ্রসর হতে থাকে বাগেরহাট ও খুলনায়। এই দুই জেলা লণ্ডভণ্ড করার পর এগিয়ে যায় ঝিনাইদহ ও যশোরে। ঝড়ের সময়টাতে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে সর্বোচ্চ ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত জারি করা ছিল।

এছাড়া ১০-১৫ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসের পূর্বাভাস ছিল। বাংলাদেশের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গেও এটি আঘাত হেনেছিল। পশ্চিমবঙ্গের উপকূলে এটি ১৫৫ থেকে ১৬৫ কিলোমিটার গতি নিয়ে আঘাত হানে। আর কলকাতার ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে যাওয়ার সময় এর বাতাসের তীব্রতা ছিল ঘণ্টায় ১৩৩ কিলোমিটার।

বিএমডির আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক যুগান্তরকে বলেন, ঘূর্ণিঝড় আম্পান বৃষ্টি ঝরিয়ে দুর্বল হয়ে গেছে। এটি বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় প্রথমে গভীর স্থল নিম্নচাপে পরিণত হয়। পরে স্থল নিম্নচাপে রূপ নেয়। এরপর বৃষ্টি ঝরিয়ে আরও দুর্বল হয়ে অস্তিত্বহীন যাবে। এর কারণে সতর্ক সংকেত কমিয়ে ফেলা হয়েছে। তিনি বলেন, গভীর স্থল নিম্নচাপে পরিণত হওয়ার আগে এটি ১৫ ঘন্টা ধরে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তাণ্ডব চালায়।

বিএমডি সূত্র জানায়, আম্পান বুধবার রাত সাড়ে ৭টার দিকে বাংলাদেশ উপকূলে অগ্রভাগ প্রবেশ করে। ওই সময়ে বরগুনার খেপুপাড়ায় ঘণ্টায় ৭৪ কিলোমিটার বেগে ঝড় বয়ে যায়। এছাড়া একই সময়ে সাতক্ষীরার কয়রায় ৭৪ কিলোমিটার, খুলনায় ৮৩ কিলোমিটার গতিবেগের ঝড় বয়ে যায়। সাত ৯টার দিকে সাতক্ষীরায় বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১৫১ কিলোমিটার।

বিএমডি এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, বিভিন্ন জেলার মধ্যে বরিশালে ৯০ থেকে ১৩০ কিলোমিটার বেগে ঝড় বয়ে যায়। বরিশালের বিভিন্ন জেলায় ১১-১২ ফুটের জলোচ্ছ্বাস হয়েছিল। ২০০৭ সালের সিডরেও এত উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস হয়নি।

রাজশাহীতে রাত ১২টায় বাতাসের গতি ছিল ৩০-৪০ কিলোমিটার। রাত ৩টার দিকে ৫৯ কিলোমিটারের ঝড়োহাওয়া রেকর্ড করা হয়। মংলায় ৭৫, হাতিয়ায় ৭৪, নওগাঁয় ৭০-৮০ কিলোমিটার বেগে প্রবাহিত হয় আম্পান।

বুয়েটের অধ্যাপক ড. একেএম সাইফুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের ঝড়গুলোর উপকূল অতিক্রমের প্রকৃতি বিবেচনায় দুই ভাগে ভাগ করা হয়। একটি হচ্ছে বরিশাল-চট্টগ্রাম উপকূল অতিক্রমকারী আরেকটি খুলনা-বরিশাল উপকূল অতিক্রমকারী। বাংলাদেশের ইতিহাসে খুলনা-বরিশাল উপকূলের দ্বিতীয় আর ১৯৬৭ সালের পরে ৫৩ বছরের মধ্যে তৃতীয় ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় এটি। এর আগে ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড় সিডরের বাতাসের গতিবেগ ২২৩ কিলোমিটার। আর ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের গতি ছিল ২২৫ কিলোমিটার। তিনি বলেন, ১৯৮১ সালের ঘূর্ণিঝড়টির গতি ছিল ১২০ কিলোমিটার ঘণ্টায়। এটি ২-৪ ফুটের জলোচ্ছ্বাস নিয়ে আসে। ১৯৮৮ সালের ঘূর্ণিঝড়টির গতি ছিল ১৬০ কিলোমিটার। তবে এটি ১৪ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস নিয়ে এসেছিল। ১৯৬৭ সালে সুন্দরবনের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঝড়ের গতি ছিল ১১১ কিলোমিটার। এছাড়া ২০০৮ সালে রাশমী ১২০ কিলোমিটার এবং ২০০৯ সালে আইলা ৯২ কিলোমিটার গতির ঝড় নিয়ে আসে। বাংলাদেশের এই উপকূলের মানুষ সিডর এবং আইলার ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে এখনও দৃষ্টান্ত দেন। সেই হিসাবে আইলার চেয়েও শক্তিশালী ঝড় ছিল এটি। আইলায় জলোচ্ছ্বাস ছিল ৭-৮ ফুট উচ্চতার। আর আম্পান নিয়ে ১০-১২ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস।

পানিউন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তারা বলছেন, ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডরের সময় কিছু এলাকায় বাঁধ উপচে পানি ওঠার ঘটনা ঘটেছিল। এরপর এবারই বাঁধ উপচে পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ার ঘটনা ঘটল। তারা এ নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে বলছেন, পাউবোর বাঁধের উচ্চতা চার থেকে পাঁচ মিটার (১২-১৫ ফুট)। এত বড় উচ্চতার বাঁধ উপচে পানি ঢুকে পড়ার বিষয়টি উদ্বেগের। কারণ সিডরের পর এ রকম ঘটনা আর ঘটেনি।

বৃষ্টি ঝরিয়ে দুর্বল আম্পান : বিএমডি ঘূর্ণিঝড়ের ওপর সর্বশেষ বিশেষ (৩৮ নম্বর) বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায়। এতে বলা হয়, ঝিনাইদহ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত ঘূর্ণিঝড় আম্পান আরও উত্তরদিকে অগ্রসর ও দুর্বল হয়ে গভীর স্থল নিম্নচাপে পরিণত হয়েছে। সকাল ৯টায় এটি রাজশাহী-পাবনা অঞ্চলে অবস্থান করছিল। এটি আরও উত্তর-উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে বৃষ্টি ঝরিয়ে ক্রমান্বয়ে দুর্বল হতে পারে। এর প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় বায়ুচাপের তারতম্যের আধিক্য বিরাজ করছে। সাগর উত্তাল আছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত জেলেদের মাছ ধরতে সাগরে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে।

এতে বলা হয়, পায়রা ও মংলা সমুদ্রবন্দরের ১০ নম্বর এবং চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরের ৯ নম্বর মহাবিপদ সংকেত নামিয়ে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত জারি করা হয়েছে। সতর্ক সংকেত নামিয়ে ফেলা হলেও জলোচ্ছ্বাস ও ঝড়োহাওয়ার সতর্ক জারি করা আছে। এতে ১৪ জেলায় জলোচ্ছ্বাসের পূর্বাভাস দিয়ে বলা হয়, বায়ুচাপর তারতম্যের আধিক্য এবং অমাবস্যার প্রভাবে উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী ও চট্টগ্রাম এবং এসব জেলার অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরগুলোয় নিম্নাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৪ থেকে ৬ ফুট অধিক উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে। এছাড়া এসব জেলা ও সংশ্লিষ্ট চর ও দ্বীপে ভারি বর্ষণসহ ৪০-৫০ কিলোমিটার বেগে দমকা বা ঝড়োহাওয়া বয়ে যেতে পারে।

আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে, আম্পানের প্রভাবে সকাল ৬টা থেকে ২৪ ঘণ্টায় চুয়াডাঙ্গায় দেশের সর্বোচ্চ ২০৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। ঈশ্বরদীতে রেকর্ড করা হয়েছে ১৬০ মিলিমিটার, ঢাকায় ৭৪ মিলিমিটার।

আরেক বিজ্ঞপ্তিতে বিএমডি বলেছে, শুক্রবার সকাল ৯টা পর্যন্ত রাজশাহী, রংপুর, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের অনেক স্থানে ভারি থেকে অতিভারি বর্ষণ বৃষ্টি হতে পারে। ৪৪-৮৮ মিলিমিটার বৃষ্টিকে ভারি এবং ৮৯ মিলিমিটারের বেশি হলে তাকে অতিভারী বৃষ্টিপাত বলা হয়।

সাত জেলায় কেড়ে নিল ১২ প্রাণ : দেশের উপকূলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সুপার সাইক্লোন আম্পানে ১২ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অর্ধশত মানুষ। তবে সরকারের স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম বলছে, ১২ জন আহত ও ১১ জন নিহত হয়েছেন। তাদের তথ্যমতে, নিহতদের মধ্যে পিরোজপুরে ৩ জন, ভোলা ও পটুয়াখালীতে দু’জন করে এবং চট্টগ্রাম, ঝিনাইদহ, যশোর ও সাতক্ষীরায় একজন করে নিহত হয়েছেন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের সহকারী পরিচালক (হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম) ডা. আয়েশা আক্তার জানান, নিহতদের মধ্যে ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে গাছচাপা পড়ে। একজন নৌকাডুবিতে, একজন ট্রলারডুবিতে এবং একজন পানিতে ডুবে মারা গেছেন। এছাড়া একজন দেয়ালচাপা পড়ে, একজন স্ট্রোক করে এবং একজন পা পিছলে পড়ে মারা গেছেন।

নিহতরা হলেন পটুয়াখালীর কলাপাড়ার সৈয়দ শাহ আলম (৫৪), পটুয়াখালীর গলাচিপার রাশেদ (৫), ভোলার চরফ্যাশনের মো. সিদ্দিক ৭২, ভোলার বোরহান উদ্দিনের রফিকুল ইসলাম (৩৫), পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার শাজাহান মোল্লা (৫৫) ও গুলেনুর বেগম (৭০), পিরোজপুরের ইন্দুরকানির শাহ আলম (৫০), যশোর চৌগাছার রাবেয়া (১৩) ও ক্ষ্যান্তা বেগম (৪৫), ঝিনাইদহ সদরের নাদিরা বেগম (৫৫), চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের সালাহউদ্দিন (১৬)।


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত মৃদুভাষণ - ২০১৪
Design & Developed BY ThemesBazar.Com