1. ahmedshuvo@gmail.com : admi2018 :
  2. mridubhashan@gmail.com : Mridubhashan .Com : Mridubhashan .Com

বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২০, ১১:০৬ পূর্বাহ্ন

এমসিতে ধর্ষণের প্রতিবেদন ‘সিলগালা’, বিচার নিয়ে শঙ্কা

মৃদুভাষণ ডেস্ক :: গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাত সিলেটের মানুষের কাছে একটি জঘন্যতম অধ্যায়। সেদিন সন্ধ্যায় রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে মুরারিচাঁদ কলেজ (এমসি) ছাত্রাবাসে স্বামীকে বেঁধে রেখে স্ত্রীকে গণধর্ষণ করেন কয়েকজন যুবক। পরে পরিচয় প্রকাশ পেলে জানা যায় অভিযুক্ত প্রত্যেকেই ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত।

এ ঘটনায় নাড়িয়ে দিয়েছিলো বিশ্ব বিবেক। এরপর থেকে সিলেটসহ সারা দেশে প্রতিবাদের ঝড় উঠে। পরে একে একে গ্রেপ্তার হয় গণধর্ষণ মামলার এজাহারভুক্ত ৬ আসামীসহ মোট ৮ জন। কিন্তু এ ঘটনার দিন যতই গড়াচ্ছে ঘটনা ততই আড়াল হচ্ছে। আর সত্য আড়াল করতেও কর্তৃপক্ষ নানা ফন্দি আঁটছেন। ফলে ন্যায় বিচার নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করছেন সিলেটের সচেতন মহল।

লুকোচুরি আর দায়িত্বে অবহেলায় শুরু থেকেই কলেজ কর্তৃপক্ষ নানাভাবে সমালোচিত হয়ে আসলেও এবার নতুন করে সমালোচনায় এসেছেন ‘তদন্ত প্রতিবেদন সিলগালা’ করে। ‘অসত্য, মনগড়া ও নিজেদের সুবিধামত তথ্য প্রতিবেদনে লিপিবদ্ধ করায় বিতর্কের ভয়ে কলেজ অধ্যক্ষ তা প্রকাশের সাহস পাচ্ছেন’ না বলে মন্তব্য সচেতন নাগরিকদের। কলেজ অধ্যক্ষ ঘটনার শুরু থেকেই বিভিন্ন গণমাধ্যমে অসহায়ত্বের সুর প্রকাশ করলেও সময়ের সাথে সাথে পাল্টে গেছে কথা। বরং এখন খুব বেশি কথা বলতেই নারাজ। এমনকি ঘটনার পরপর তাৎক্ষনিক কর্তব্যে অবহেলার কারণে ২ জন নিরাপত্তা প্রহরীকে বরখাস্ত করেই দায় সারেন কর্তৃপক্ষ। এরপর শুরু হয় তাদের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম।

ঘটনা তদন্তে কলেজ কর্তৃপক্ষ ২৬ সেপ্টেম্বর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। প্রথমে কলেজের গণিত বিভাগের প্রধান আনোয়ার হোসেনকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির দুজন সদস্য হিসেবে ছাত্রাবাসের তত্ত্বাবধায়ক (হোস্টেল সুপার) মো. জামাল উদ্দিন ও জীবনকৃষ্ণ ভট্টাচার্যকে সদস্য রাখা হয়। সাত কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করার নির্দেশনা ছিল। পরে স্বয়ং হোস্টেল সুপারের কক্ষ দখল করে সাইফুরের অবস্থানসহ নানা বিষয়ে ছাত্রাবাসের দুজন তত্ত্বাবধায়ক কমিটিতে থাকা নিয়েও প্রশ্ন উঠলে ওই দুই সদস্য অব্যাহতি নেন। পরে তদন্ত কমিটিতে কলেজের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক বেলাল উদ্দিন ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক বিভূতিভূষণ রায়কে নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করে তদন্ত কার্যক্রম চলে। প্রথমে ৭ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ থাকলেও শুরুতেই হোঁচট খায় এ কমিটি। নির্ধারিত সময়ে তাদের দায়িত্ব সম্পন্ন করতে না পারায় আরও ৫ দিন সময় বাড়ান হয়। সব মিলিয়ে তদন্ত শেষ হলে এখন প্রতিবেদন প্রকাশ নিয়ে দেখা দিয়েছে জটিলতা। নিয়ম অনুযায়ী কলেজ কর্তৃপক্ষ থেকে প্রতিবেদন প্রকাশের কথা থাকলেও কলেজ অধ্যক্ষ প্রতিবেদনটি সিলগালা করে রেখেছেন।

অবশ্য প্রতিবেদন প্রকাশ না করার কারণ হিসেবে এমসি কলেজের অধ্যক্ষ সালেহ আহমদ বলেন, ‘যেহেতু বিচার বিভাগীয় তদন্ত চলছে, তাই আপাতত আমাদের প্রতিবেদনটি সিলগালা করা হয়েছে। বিচার বিভাগীয় তদন্ত শেষ হলে আমরা আমাদের প্রতিবেদনটি প্রকাশ করব।’

আর প্রতিবেদন প্রকাশ না করে সিলগালা করার কারণকে সত্য আড়াল করে সুবিধামত প্রতিবেদন প্রকাশের কৌশল হিসেবে মন্তব্য করেছেন সম্প্রতি ধর্ষণকাণ্ডে গঠিত ‘দুষ্কাল প্রতিরোধে আমরা’ এর সংগঠক আব্দুল করিম। তিনি বলেন, ‘তাদের উচিৎ হচ্ছে প্রতিবেদন প্রকাশ করে ঘটনার সত্যতা মানুষকে জানানো এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া। কিন্তু তারা তা করছে না। কারণ তারা চায় প্রতিবেদন আপাতত আটক রেখে পরে বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন কি আসে এটির উপর একটি সুবিধামত প্রতিবেদন প্রকাশ করতে। কিন্তু বিচার বিভাগীয় তদন্তের কারণে কলেজ কর্তৃপক্ষ তাদের নিজস্ব প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারবে না তা ঠিক না। কারণ, এটা তাদের কলেজের অভ্যন্তরীণ তদন্ত।’

একই মন্তব্য সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরীরও। তিনি বলেন, ‘শুরু থেকেই তারা নানাভাবে সত্য আড়াল করার চেষ্টা করছে। এখন তারা যে প্রতিবেদন তৈরি করেছে এটা নিশ্চয় সত্য আড়াল করে নিজেদের সুবিধামত করেছেন। কারণ কাক কখনও কাকের মাংস খাবার কথা না। তাই অধ্যক্ষ সাহেব ভাবছেন এটা প্রকাশ করলে হয়ত বিপদে পড়ে যেতে পারেন। তাই প্রকাশ করছেন না। তবে আমি মনে করি মনগড়া প্রতিবেদন প্রকাশ না করাই ভালো। তারচেয়ে বিচার বিভাগীয় প্রতিবেদনই আগে আসুক।’

এদিকে সত্য আড়াল করার কৌশল আঁটতে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হচ্ছে না এমন মন্তব্যের ব্যাপারে অধ্যক্ষ মো. সালেহ আহমদকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ‘কলেজে আসেন। আমি ফোনে এত কথা বলতে পারব না’।

অপরদিকে গৃহবধূকে গণধর্ষণের ঘটনায় জড়িত চার আসামির ছাত্রত্ব এবং সার্টিফিকেট বাতিল করেছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। পাশাপাশি তাদের স্থায়ীভাবে এমসি কলেজ থেকে বহিষ্কারও করা হয়েছে।

সোমবার (১২ অক্টোবর) জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট কমিটির বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বহিষ্কৃতরা হলেন, সাইফুর রহমান, শাহ মাহবুবুর রহমান রনি, মাহফুজুর রহমান মাসুম ও রবিউল হাসান।

এর আগে ঘটনার কয়েকদিন পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে গণধর্ষণের ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি এমসি কলেজে তদন্ত করতে আসে। তদন্ত শেষে তারা তাদের প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে।

এদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গাফিলতি কিংবা পক্ষপাতিত্বের কারণে ন্যায় বিচার নিয়েও শংকা প্রকাশ করেছেন ফারুক মাহমুদ চৌধুরী ও আব্দুল করিম কিম। তারা দুইজনই বলেন, ‘আন্দোলনের মুখে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হলেও সংশ্লিষ্টদের পক্ষপাতিত্বের কারণে মামলার ন্যায় বিচার নিয়েও ভয় আছে। তাই তথ্য গোপন না করে সকল তথ্য জানানো উচিৎ। এ মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া কোন পর্যায় আছে সেটিও জানা নেই। সুতরাং বিচার প্রক্রিয়া কি হবে বুঝতে পারছি না।’

তবে মামলার কার্যক্রম দ্রুত গতিতে এবং সঠিক ভাবেই চলছে বলে জানিয়েছেন সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (গণমাধ্যম) বিএম আশরাফ উল্যাহ তাহের বলেন, ডিএনএ নমুনা ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। সার্বক্ষণিক তদন্ত কর্মকর্তা যোগাযোগ করছেন। তাছাড়া বাকি সকল কাজই সঠিকভাবে চলছে। আশা করি দ্রুত সময়ের ভিতর তদন্ত প্রক্রিয়া শেষ হবে।

অপরদিকে এ ঘটনার পর থেকে এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন ২ শিফটে ৪ জন নিরাপত্তাকর্মী আর কলেজের ৪ জন অফিস সহায়ক। সকাল ৮ টা থেকে রাত ৮ টা পর্যন্ত ২ জন ও রাত ৮ টা থেকে সকাল ৮ টা পর্যন্ত ২ জন নিরাপত্তাকর্মী দায়িত্ব দায়িত্ব পালন করেন। এসময় তাদের সাথে কলেজ কর্তৃপক্ষ থেকে নাম নিবন্ধ করে প্রবেশ ও বাহিরের কাজে নিয়োজিত থাকেন ২ জন করে ৪ জন অফিস সহায়ক।

বুধবার (১৪ অক্টোবর) সন্ধ্যার পর সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় মূল ফটক তালা দেওয়া। ভিতরে টেবিল নিয়ে বসে আছেন ২ জন অফিস সহায়ক। আর গেটে দায়িত্বে আছেন ২ জন নিরাপত্তাকর্মী। কেউ প্রবেশ করতে চাইলে খাতায় নাম নিবন্ধন করা হচ্ছে।

এর আগে শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ৭ টার দিকে সিলেট এমসি কলেজের হোস্টেলে ওই গৃহবধূকে গণধর্ষণ করেছে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী। অভিযুক্ত এসব কর্মীরা সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক রণজিৎ সরকারের অনুসারী বলে জানা গেছে।

এদিকে তরুণীকে গণধর্ষণের ঘটনায় ৬ জনকে আসামি করে এসএমপির শাহপরাণ থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। নির্যাতিত ওই তরুণীর স্বামী মাইদুল ইসলাম বাদী হয়ে এ মামলা দায়ের করেন।

মামলায় আসামিরা হলেন- সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার উমেদনগরের রফিকুল ইসলামের ছেলে তারেকুল ইসলাম তারেক (২৮), হবিগঞ্জ সদরের বাগুনীপাড়ার মো. জাহাঙ্গীর মিয়ার ছেলে শাহ মো. মাহবুবুর রহমান রনি (২৫), জকিগঞ্জের আটগ্রামের কানু লস্করের ছেলে অর্জুন লস্কর (২৫), দিরাই উপজেলার বড়নগদীপুর (জগদল) গ্রামের রবিউল ইসলাম (২৫) ও কানাইঘাটের গাছবাড়ি গ্রামের মাহফুজুর রহমান মাসুমকে (২৫)। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও তিনজনকে আসামি করা হয়।

মামলার প্রেক্ষিতে র‍্যাব ও জেলা পুলিশের অভিযানে আটক ৮ জন কারাগারে আছে। গ্রেপ্তার সকলকেই ৫ দিন করে রিমান্ডে পায় পুলিশ। রিমান্ড শেষে তাদেরকে আদালতে হাজির করা হলে তারা সকলেই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেন।


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত মৃদুভাষণ - ২০১৪
Design & Developed BY ThemesBazar.Com