1. ahmedshuvo@gmail.com : admi2018 :
  2. mridubhashan@gmail.com : Mridubhashan .Com : Mridubhashan .Com

শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৪:০০ অপরাহ্ন

আমাদের বিয়ে

হাসান তানকিউল এর বিবাহের ছবি

হাসান তানকিউল :: আমার বিয়ের দিনের গল্প বলি । কেন বলছি তার কারণ বলা যেতে পারে। আজ ১৪ই আগস্ট ২০১৮। আমাদের ২০তম বিবাহবার্ষিকী । ভাবতে অবাক লাগে , মেঘে মেঘে অনেক বেলা হয়েছে । বাবা হয়েছি , মাথার চুলে পাক ধরেছে আর টাঁকটাও কিঞ্চিত দৃশ্যমান। বিশাল বপুর কথা না হয় বাদই দিলাম। চোখেও ইদানীং কম দেখছি । আমি মানুষটা কিছুটা হলেও অদ্ভুত প্রকৃতির তার কারণ বিবাহবার্ষিকী , জন্মবার্ষিকী ইত্যাদি আমার মনে থাকে না। বিগত ২/৩ বছর ধরে এ দায়িত্ব স্মার্ট ফোনের উপর ছেড়ে

স্ত্রীর সাথে হাসান তানকিউল

দিয়েছি। যেমন, আজ রাত বারোটার দিকে আমার ফোনে যখন এলার্ম বাজা শুরু করলো তখন বুঝতে পারলাম বিবাহবার্ষিকীর মাহেন্দ্রক্ষণের উদয় হয়েছে , এ মুহূর্তে আমার উচিত স্ত্রী বেচারিকে ফোন করে শুভেচ্ছা জানানো। সে নিশ্চয়ই আনন্দে আর আহ্লাদে উতলা হয়ে উঠবে ?

ওকে ফোন ঘোরালাম । ফোন ধরে সে হল বিরক্ত। এতো রাতে ফোন করেছো কেন ? বাসার সবাই ঘুমে !!! আমি কি বলব খেই হারিয়ে ফেললাম। অগত্যা শুভেচ্ছা না জনিয়েই লাইন কেটে দিলাম ।

বিয়ের আগের রাতে বর /কনে কারোরই ভালো ঘুম হয় না বলে আমার ধারণা । উত্তেজনার ব্যাপার আছে। জীবনের নতুন এক অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে। আতঙ্কে আর আনন্দে ঘুম চোখ থেকে উড়ে যাবার কথা। আমারও চোখ থেকে ঘুম হাওয়া হয়ে গিয়েছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে , সে রাতে আমার বাবা আর নানা আমার শোবার ঘরে শুয়েছিলেন । তাঁদের নাক ডাকানোর বিকট শব্দের যন্ত্রণায় সারা রাত এক-ফুটো ঘুমোতে পারিনি ।

আমার বিয়ের দিন ভোরবেলা আমি এক নাটক করলাম। আমার বাবা আর আমার ছোট চাচা একজন আরেকজনের সাথে কথা বলেন না প্রায় পাঁচ বছর। একই রাস্তা দিয়ে দুজন এমনভাবে হেঁটে যান দূর থেকে দেখলে এনাদের মনে হবে এনারা একে অপরের অপরিচিত। বিয়ের দিন আমার ঢাকার চাচা এক প্লান ফাঁদলেন।

আমাকে বললেন, তুই বিয়ের দিন ভোরবেলা দুজনকে তোর রুমে ঢোকাবি ,আমিও সাথে থাকব তারপর তাদের বলবি

-“তোমরা যদি তোমাদের রাগ না ভাঙ্গাও আমি বিয়ে করবো না ”

মজার ব্যাপার হল, তাদের রাগ সেদিন ভেঙ্গেছিল । দু ভাইয়ের একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। এটি আমার জীবনে দেখা মধুরতম দৃশ্যের একটি।

বেলা সাড়ে এগারোটার দিকে সব চাচাত ,ফুফুত ভাইবোনদের নিয়ে নাস্তা করলাম । আয়োজন ছিল রাজসিক । কোরমা ,পোলাও , আস্ত মুরগির রোষ্ট । যেহেতু দিনটি ছিল শুক্রবার পাড়ার মসজিদে নামাজের শেষে আমার ছোট চাচা আমাকে পাগড়ী , শেরওয়ানী পরিয়ে দিলেন ।

আমরা বরযাত্রা শুরু করলাম। গন্তব্য নুর-জাহান সেন্টার । আমাদের গাড়ির বহর যখন সিলেট স্টেডিয়ামের কাছাকাছি পৌঁছেছে পাশে এক রিক্সায় দেখি আমার অতি পরিচিত দুই বন্ধু গাড়ির ভেতর উঁকিঝুঁকি দেবার চেষ্টা করছে। আমি ফট করে মুখ লুকিয়ে ফেললাম। আয় হায় !!!এদের তো দাওয়াত দিইনি। যাই-হোক ধরা খেতে খেতে বেঁচে গেলাম। হা হা হা

বিয়ের সেন্টারে পৌঁছনোর পর যখন স্টেজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি ওই মুহূর্তে আমি সত্যিকার অর্থেই ভড়কে গেলাম। নিজেকে কোন এক বিচিত্র কারণে খুব অপ্রস্তুত মনে হচ্ছিল । সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছে কেন ? ক্যামেরাম্যান হারামজাদা আমাকে বারবার বলছে , ভাইয়া একটু আস্তে আস্তে হাঁটেন , (আমি হ্যাঁটার গতি কমিয়ে দিলাম ) এবার সে বলল , ক্যামেরার দিকে তাকান । আমার তখন ইচ্ছে করছিল শালারে লাথি মেরে তিন হাত দূরে ফেলে দেই ! আসলে ওই সময়ের মানসিক অবস্থা বুঝানো মুস্কিল। আমার দুপাশে ছিলেন আমার দুলাভাই , ছোট ভাই আর ফুফুত ভাই। ফুফুত ভাই আমাকে কানে কানে বললেন তোকে দেখে মনে হচ্ছে অল্প কিছুক্ষণ পর তোর ফাঁসি হবে ! “স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা কর” এই বলে আমাকে অভয় দিলেন হয়তবা উনি বুঝতে পেরেছিলেন , আমার অবস্থা প্রায় “ছেড়াভেড়া” ।
স্টেজে বসার পর আমার শ্যালক ,শ্যালিকারা একে একে আসতে লাগলো । এদের সবার বয়স ৮ থেকে ১২ র ভেতর। বদের হাড্ডি একেকটা। ইচ্ছে করছিল ধরে একটা আছাড় দেই। হয়তো কারো কাছ থেকে শুনেছে দুলাভাই রঙ তামাশার মানুষ। আমাকে নিয়ে তারাও নানান রঙ তামাশার মেতে উঠলো। রঙ তামাশার দুই একটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে ।

রঙ তামাশা উদাহরণ নং ১ : আমার পানির গ্লাসে লবণ ঢেলে দিল।
রঙ তামাশা উদাহরণ নং ২ : আমার জুতো জোড়া লুকিয়ে ফেলল।

খাবার হিসেবে আমাকে দেয়া হল আস্ত খাসির রোস্ট ( যার ভেতর পুরোটাই কাঁচা ) আমি খেতে পারিনি । খাবার পর স্টেজে বসে আছি । প্রচণ্ড সিগারেটের নেশা চেপেছে । কি করব ভাবছি ! ছোটমামাকে বললাম , সিগারেট না খেলে আমি মারা যাব ! সিগারেটের ব্যবস্থা করো ! ছোট মামা ব্যবস্থা করলেন । আমাকে নিয়ে বাথরুমে গেলেন । বাথরুমে ঢুকে আমি সিগারেটে কষে
কয়েক টান দিলাম । সিগারেট শেষ করে স্টেজে ফিরে এলাম । প্রচুর বন্ধুবান্ধব আমাকে ঘিরে বসে আছে । আমার মায়ের চাচা ছোট নানা স্টেজে এলেন । এসেই কানে কানে আমাকে বললেন , নাতি ঠিক মতো খাওয়াদাওয়া করেছো তো ? আজ রাতে তোমাকে অনেক পরিশ্রম করতে হবে এই বলে , আমার পকেটে দুটো কনডম ঢুকিয়ে দিলেন । তারপর বললেন এগুলো রাখ , কাজে দেবে ! আমি হতভম্ব হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকলাম । দেখি বুড়া মিটিমিটি হাসছে !

বিকেলের দিকে বর কনেকে এক করা হল । খালা , মামা ,বাবা ,চাচা ,নানা,নানী চেনা অচেনা লোকজনকে সালাম করতে করতে আমার কোমর ব্যথা হয়ে গেল । কি যন্ত্রণা । এবার বিদায়ের পালা ।

আমাদের বিয়ে হয়েছিলো শ্রাবণ মাসের ৩০ তারিখে। বিকেলে প্রচণ্ড বেগে বৃষ্টি পরছিল । আমার স্ত্রী তার মা বাবাকে ধরে ততক্ষণে মরাকান্না শুরু করেছে ।আমি অল্প দুরে দাঁড়িয়ে আছি , কিছুটা অপ্রস্তুত । কি করব ভেবে পাচ্ছি না ।তাঁদের কান্না দেখে কোন এক বিচিত্র কারণে আমার নিজেরও খারাপ লাগছে । আবার খারাপ লাগার কোন কারণও খোঁজে পাচ্ছি না । অবশেষে কান্নাকাটির অবসান হল । আমি গাড়িতে উঠে পরলাম ।

গাড়ি চলছে । প্রচণ্ড বৃষ্টির কারণে ড্রাইভার কিছুই দেখছে না । ড্রাইভারকে সাহায্যে আমি ব্যস্ত হয়ে পরলাম । তাকে বলছি এদিক যা ,ওদিক যা ! আমার পাশে বসা ভাবি বললেন , এই তুমি চুপচাপ বসে থাকতো ।নতুন জামাইরা এসব বলে না ।মুখে রুমাল দিয়ে চুপচাপ বসে থাক ।

তার কথামত আমি চুপ মেরে গেলাম । তারপর তাকালাম স্ত্রীর দিকে । কান্নাকাটির কারণে তাঁর চোখের দু’পাশে কাজল ল্যাপ্টে আছে । দেখতে ভয়ংকর লাগছে ! কোন এক বিচিত্র কারণে সে আমার দিকে তাকাচ্ছে অপরিচিত ভঙ্গিতে যেন সে আমাকে চেনে না ! কি যন্ত্রণা ! আমি কি বলব ভেবে পেলাম না । অগত্যা পকেট থেকে POLO ( পোলো মিন্ট ক্যান্ডি ) বের করে দুটা মুখে পুরলাম , গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে । কান্নাকাটি করেছে আমার স্ত্রী অথচ গলা শুকিয়েছে আমার ! রহস্যময় ব্যাপার ! পকেট থেকে আরও দুটো POLO বের করে ওকে বললাম , খাবে ? সে আহত চোখে আমার দিকে তাকাল। আমি POLO খেতে ব্যস্ত হয়ে পরলাম।

বিয়ের দিনে আমি চরম অস্বস্তি বোধ করি যখন আমাকে আর স্ত্রীকে রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। আমার প্রচণ্ড লজ্জা লাগছিলো। আমার এক ভাবি (অতি বদ টাইপ ) আমাকে কানে কানে বললেন , এই তোমাকে কি কিছু শিখিয়ে দিতে হবে ? সাথে সাথেই আবার মিষ্টি হাসি দিয়ে বললেন , নাহ লাগবে না তুমি অনেক ঘাগু জিনিষ ! এক কাজ করো , বউকে কোলে করে রুমে নিয়ে যাও।

আমি ফট করে বলে ফেললাম , “আমি কি শাহরুখ খান “? হা হাহা।

বিছানা প্রচুর ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছিল। তা আমি হাড়ে হাড়ে টের পেলাম যখন গোলাপের কাঁটা আমার পশ্চাৎ দেশে আঘাত করলো। ফুলসজ্জা সবসময় আনন্দের নয়।

 

একজন হোসেন আলী


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত মৃদুভাষণ - ২০১৪
Design & Developed BY ThemesBazar.Com