1. ahmedshuvo@gmail.com : admi2018 :
  2. mridubhashan@gmail.com : Mridubhashan .Com : Mridubhashan .Com

মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১১:২৬ পূর্বাহ্ন

বরফ রাজ্য মানালিতে

নার্গিস জাহান :: পর্যটকের লেবেল গায়ে লাগিয়েছোতো হলো,সক্কাল সক্কাল ঘুম থেকে উঠো, নাস্তা সারো আর দে ছুট কোন এক নতুনের দর্শনে।শৈল শহরে আজ তৃতীয় আর শেষ দিন।সকালের নাস্তা সেরেই ছুটে চললাম তত্তপানির উদ্দেশ্যে।
সিমলা থেকে ৫০কিঃমিঃদূরে তত্তপানির অবস্থান।ওখানে রয়েছে এক সালফিউরাস উষ্ণ প্রসবন। মনে করা হয় এতে রয়েছে ভেষজ উপাদান।আর তাই চিকিৎসক ও পর্যটকের জন্য জায়গাটা বেশ জনপ্রিয়।

চলতে চলতে আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করলাম পরিবেশ সংরক্ষণ করে কিভাবে পাথুরে পাহাড়ের গায়ে দৃষ্টিনন্দন লাল নীল বাড়িঘর তৈরী করা হয়েছে।ছোট্ট শহর অথচ ছিমছাম পরিপাটি। এখানকার কুকুরগুলো কেমন লোমশ আর নাদুসনুদুস।এটা একটা দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার কোন মাপকাঠি কিনা জানিনা।

তত্তপানিতে যেতে যেতে চোখে পড়লো নদীর উচ্ছল আর ফেনিল ছুটে চলা। বড় বড় পাথরের গায়ে আছড়ে পড়া ঢেউগুলো যেন খিলখিল করে হেসে উঠছিল।আর এমন পরিবেশে রাফটিং হবেনা তা কি আর হয়।কিছুদূর পর পরই চোখে পড়ছিল রাফটিং পয়েন্ট।তত্তপানিতে এসে দেখলাম পান্ডোহ ড্যাম।নদীর উপর বাঁধ দিয়ে সরকারীভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এই ড্যাম তৈরী করা হয়েছে।এলাকাটা খুবই সুন্দর,ড্যাম তৈরির আগে নাকি আরোও সুন্দর ছিল।ইচ্ছে করছিল গাড়ী থেকে নামি, ছবি তুলি কিন্তু না কিছু-ই করা যাবে না।এলাকাটা কঠোরভাবে সংরক্ষিত করা।শুনা যায় অতীতের কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্য এ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।উষ্ণ প্রসবনে যেতে মন্দিরের খুঁজ করতে করতে অবশেষে গাড়ী থেকে নেমে কাচা মাটির ঢালু পথ বেয়ে নামতে লাগলাম। রাস্তার পাশেই কিছু লোককে গোসল করতে দেখলাম।প্রসবনের গল্প শুনতে যেরকম লেগেছে আমার কাছে তেমননটি লাগেনি। হয়তো পূজার সময় হলে মেলা বসলে এখানে ধর্মীয় উৎসব হয়। নদীর পাড়ে একটা নির্মাণাধীন ঘরে বসে গল্প করতে করতেই বাতাস গরম হয়ে উঠছিল অর্থাৎ দুপুর ছুঁই ছুঁই করছিল।এবার অন্য কোথাও যাবার পালা। সিদ্ধান্ত হলো যাওয়ার পথেই কোথাও দুপুরের খাবার সেরে নিব কিন্তু ভাগ্য খারাপ সেই ভেজ ননভেজ, হারাম হালাল করতে করতে অনেকক্ষণ পর একটা মোটা মোটামুটি পছন্দ হওয়াতে সবাই গাড়ী থেকে নামলাম।আমাদের অর্ডার দিতে বলে খান সাহেব অজু করে নামায পড়বেন বলে ওয়াশরুমে ঢুকলেন।অর্ডার দিতে না দিতেই খান সাহেব এসে বললেন এখানে নামাজ পড়া নিষেধ আর কর্মচারী বলেছে যে আমাদের জন্য খাবারটাও হালাল না। আর কিসের অর্ডার বের হয়ে আসলাম সবাই।কিন্তু পছন্দমত হোটেল পাওয়া যাচ্ছে না তাছাড়া একটা হোটেল থেকে আরেকটা হোটেলের দূরত্বও কম না। দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে দেখে আবারো আমরা মল রোডে গিয়ে উঠলাম। খাওয়াদাওয়া কেনাকাটা আর ঘুরাঘুরিতেই শেষ হয়ে গেল সিমলা সফর।আমার মেয়ে ফাঁকে একখানা লুডুবোর্ডও কিনে নিল।ফিরে এলাম অস্হয়ী ঠিকানায়। দুপুরের দুঃখে আসার সময় খিচুড়ি র সরঞ্জাম আর ডিম কিনে আনলাম।এসে ফ্রেশ হয়ে রান্নাঘরে খিচুড়ি রান্না করে ডিম ভাজা দিয়ে ড্রাইভার সহ সবাই খেয়ে ঘুম দিলাম।

ভোরবেলা উঠে মীনাজীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাংলাদেশে আসার আমন্ত্রণ জানিয়ে মানালির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম।

মানালিঃ ভারতের হিমাচল প্রদেশের গুরুত্বপূর্ণ হিলস্টেশনগুলোর মধ্যে মানালি হচ্ছে একটি।হিমাচলকে বলা হয় হিমালয়ের তৃতীয় মেরু আর মানালি হচ্ছে এ উপত্যকার বরফ রাজ্য। ১৯৫০মিঃ উচ্চতার মানালির অবস্থান বিয়াস নদীর উপত্যকায়।।হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী মনু দেবতার নাম অনুযায়ী এ জায়গার নামকরণ করা হয়েছে।আক্ষরিক অর্থ হচ্ছে মনুর বাসভূমি।

কথিত আছে প্রাচীনকালে মানালিতে বিক্ষিপ্তভাবে”রাক্ষস ” নামে এক যাযাবর শিকারি সম্প্রদায়ের লোকের বাস ছিল। পরবর্তীতে এখানে কাংরা উপত্যকা থেকে আসা মেষপালকদের আগমন ঘটে।এরা এসে মানালিতে কৃষিকাজে লিপ্ত হয়ে যায়।প্রাচীনতম বসবাসকারীদের মধ্যে অন্যতম ছিল”নৌর”অথবা নর।বিচিত্র উপজাতির এই নর কিছুসংখ্যক এখনো কুল্লুতে রয়েছে।।মানালির পশ্চিম তীরে হরিপুরের কাছে সোয়াল গ্রামে রয়েছে এক নর পরিবার।এ পরিবার বস্তির জমির অধিকার বলে রাক্ষসদের শ্রমজীবী হিসাবে ব্যবহার করে এলাকায় বিখ্যাত হয়েছিল।

ইংরেজরা ই প্রথমে এখানে আপেল আর টাউট মাছের চাষ করে।এর আগে মানালিতে এসবের কোন অস্তিত্ব ছিল না।কথিত আছে প্রথম প্রথম আপেলের এত বেশি ফলন হতো যে আপেলের ভারে গাছের ডাল ভেঙ্গে যেতো। এখন পর্যন্ত এখানকার প্রধান জীবিকার উৎস আপেল আর প্লাম চাষ।

যেহেতু ভোরে বের হয়েছি তাই তাই পথিমধ্যে রাস্তার পাশে হোটেলে সকালের নাস্তা করতে নেমে পড়লাম।।নাস্তার অর্ডার নিতে নিতে ওয়েটার গল্প করতে লাগলেন যাত্রা পথে এখানে কোন কোন তারকারা নাস্তা করে গেছেন।পাশের দেয়ালে সোনম কাপুর ও আরো কয়েকজন তারকার ছবি দেখলাম।।যাই হোক গরম গরম চা নাস্তা খয়ে আবারো রওয়ানা দিলাম।আপেলের গাছ আর সবুজ পাতায় সকালের রোদ ঝলমল করছিল।আরো কিছুদূর যাওয়ার পর আম্বুজা সিমেন্ট কারখানার র পাশ দিয়ে অতিক্রম করলাম।।পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু মটরওয়ে দিয়ে গাড়ী ছুটছে দুরন্ত গতিতে।।কোথাও ভাঙ্গাচুরা রাস্তা নাই তারপরও সাথে চলছে উন্নয়নের কাজ।।কুল্লুতে নাকি শালের কারখানা আছে আর দামেও তুলনামূলক কম তাই কুল্লুর শালের দোকানের সারির সামনে আবারো নামলাম।ফাঁক দিয়ে দোকানের বারান্দা থেকে পানিপুরী খাওয়া হলো।।মোটামুটি আইডিয়া নিয়ে পরবর্তী দিন আসার প্লান নিয়ে মানালির দিকে রওয়ানা হলাম।কারণ হাতে সময় কম, দুপুরের খাওয়া বাকী, দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছ।কুল্লুতে দুপুরের খাবার সেরে মানালির দুর্গম পথ ধরে আবারো ছুটলাম। তখন বিকাল প্রায়, মানালি যে এত সুন্দর ভাবতেও পারিনি।পাহাড়ের চূড়ায় চূড়ায় পড়ন্ত সূর্যের কিরণে সাদা বরফ ঝিকিমিকি করছিল।আহা!গ্রীষ্মেও যে বরফ দেখতে পাবো এ আমার কল্পনায়ও ছিলনা।
হাই রাইজিং বিল্ডিং এর ফাঁকে ফাঁকে একটুকরো আকাশ দেখা মানুষ বিস্তীর্ণ খোলা নীল আকাশ, পেজো মেঘ,সবুজ বনানী,দূরে হিমালয়ের মায়াবী হাতছানি, নদী ঝর্ণা ঘন সবুজ বন প্রকৃতির এই ভালবাসার বন্ধন দেখে উতলা হয়ে যাচ্ছিলাম,বুঝে উঠতে পারছিলাম না কার ভালবাসায় নিজেকে বিলীন করে দেবো।গাড়ী ছুটছেতো ছুটছে একদিকের ছবি তুলছিতো অন্যদিকে মিস হয়ে যাচ্ছে আর প্রকৃতি প্রেমে হাবুডুবু খেতে খেতে এক সময় দুর্গম রাস্তাটা পৌঁছে গেল মানালির হরিপুরে,যেখানে বুকিং করা আমাদের হোটেল।

তখন সন্ধ্যা নেমেছে, হোটেলের চারপাশে গোলাপি আপেলের বাগান।পরিবেশ বান্ধব হোটেলে বেশির ভাগ-ই কাঠের ব্যবহার করা হয়েছে।।হোটেলের কর্মচারীরা বেশ আন্তরিক।নাস্তা কিংবা খাবার সবটাই নিজের মত করে অর্ডার করার সুবিধা থাকায় আরাম করে সন্ধ্যার চা রাতের খাবার খেলাম।নীচে ঘুরে দেখার নাম করে মাঝখানে রাবি,কবীর,সামিয়া মাঝে বার্গারও খেয়ে আসলো।ডিনার শেষে কতক্ষণ লুডু খেলাও চললো।এক সময় ক্লান্তি এসে আমাকে নিয়ে গেল ঘুমের রাজ্যে।মাঝ রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেল।দূরে একদল কুকুর অবিরাম ঘেউ ঘেউ ডেকে যাচ্ছিল।ঘেউ ঘেউ শুনে কেন জানিনা(চিন্তার উপর কোন টেক্স নাই কিনা)শরৎ চন্দ্রের শ্রীকান্তের ‘নতুনদা’র কথা মনে পড়ে গেল।এখানেও কি কোন পর্যটককে কুকুরগুলো ঘিরে ধরেছে কি না কে জানে।নতুনদা’র একপাটি চকচকে জুতার কথা ভাবতে ভাবতে আবারো নিদ্রার কোলে ঢলে পড়লাম।চলবে……


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত মৃদুভাষণ - ২০১৪
Design & Developed BY ThemesBazar.Com