1. ahmedshuvo@gmail.com : admi2018 :
  2. mridubhashan@gmail.com : Mridubhashan .Com : Mridubhashan .Com

শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১০:৫৬ অপরাহ্ন

সিলেটে শিকারীর কাছ থেকে লটকন ও চন্দনা টিয়া অবমুক্ত

আব্দুল করিম কিম :: সকালে পরিবেশ কর্মী ও ডেইলি স্টার প্রতিনিধি দ্বোহা’র ফোন আসে । দ্বোহা জানায়, জিন্দাবাজার এলাকায় একজন পাখি বিক্রেতার কাছে ৪টি দেশীয় টিয়া পাখি আছে । সে দীর্ঘ সময় থেকে পাখি বিক্রেতাকে অনুসরণ করছে । আমি দ্রুত রেডি হয়ে জিন্দাবাজারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই । সাথে পেয়ে যাই পরিবেশকর্মী বদর চৌধুরী কে । দ্বোহা পাখি বিক্রেতার সর্বশেষ অবস্থান জানায় জিন্দাবাজার রাজা ম্যানশন । নগরের প্রানকেন্দ্রে প্রকাশ্যে দেশীয় পাখি বিক্রি চলছে । পাখি শিকারীরা পাখি ধরছে আর ক্রেতারা খাঁচায় পোষার জন্য পাখি কিনছে । যেতে যেতে বিভাগীয় বন কর্মকর্তাকে ফোন করি । তিনি তৎক্ষণাৎ ঘটনাস্থলে বন কর্মকর্তাদের পাঠানোর কথা বলেন । আমরা রাজা ম্যানশনের সামনে পৌঁছাতেই দেখি মানুষের ভীড় । রাজা ম্যানশনে ভূমি সন্তান বাংলাদেশের সমন্বয়ক আশরাফুল কবীর পৌঁছালে পাখি বিক্রেতা বুঝে যায় বিপদ সন্নিকট । ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া জার্নালিস্ট এসোসিয়েশনের সভাপতি আশরাফ ভাইকে সবাই চেনে । ইতিমধ্যে দ্বোহা পাখি বিক্রাতাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করতেই সে এবারের মত ক্ষমা চেয়ে চলে যেতে চায় । আমি পৌঁছাতেই উপস্থিত উৎসুক জনতার মধ্যে দু’একজন বলেন, কিম ভাই এসেছেন আর নিস্তার নেই । ইতিমধ্যে ঘটনাস্থলে বন বিভাগের গাড়িতে বন কর্মকর্তাদের একটি দল এসে পৌঁছে । বন কর্মকর্তারা বিক্রেতাকে কোর্টে চালান দিতে চাইলে উপস্থিত জনতার মধ্যে বয়স্ক দু’একজন এবারের মত ক্ষমা করে দিতে বলেন । উপস্থিত জনতার মধ্যে পাখি শিকার বন্ধে বন বিভাগের কার্যকর উদ্যোগ না থাকার অভিযোগ আসে । উপস্থিত জনতাকে তখন বলি, বন বিভাগ পাখি শিকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান করে না বলেই, পাখি বিক্রি বেড়েছে । আপনাদের এই অভিযোগের সাথে আমরা সম্পূর্ন একমত । কিন্তু তাই বলে আইনের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ এই খাঁচা বন্দি পাখি বিক্রেতাকে ফেরত দেয়ার প্রশ্নই আসে না । দীর্ঘ বাদানুবাদ শেষে দেশীয় পাখি আমাদের পরিবেশ-প্রতিবেশের জন্য রক্ষা করা যে অত্যন্ত জরুরী সেই বিষয়টি তুলে ধরে পাখিগুলো নিয়ে আমরা টিলাগড় ইকো পার্কের দিকে রওয়ানা হই ।

টিলাগড় ইকোপার্কের উঁচু টিলায় পাখিগুলো নিয়ে যাওয়া হয় । সেখানে পাখিগুলো অবমুক্ত কালে আমার সাথে দ্বোহা চৌধুরী ও বদরুল ইসলাম চৌধুরী ও ডেইলি স্টারের ফটো সাংবাদিক শেখ নাসির উপস্থিত ছিলেন । এসময় বন বিভাগের পক্ষে টিলাগড় বন বিট কর্মকর্তা চয়নব্রত চৌধুরী, বনরক্ষী আবু তাহের, আব্দুস সাত্তার, আবু সাঈদ চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন ।পাখি চারটির মধ্যে ২টি ছিল লটকন টিয়া ও ২টি চন্দনা টিয়া ।

লটকন টিয়াঃ
লটকনের ইংরেজি নাম Vernal Hanging Parrot. বৈজ্ঞানিক নাম Loriculus vernalis. দৈর্ঘ্য ১৪ সেমি। ওজন ২৮ গ্রাম। একনজরে হলুদাভ-পাতা সবুজ রঙের পাখি। পুরুষটির গলা-বুকের উপরিভাগটা নীল। খাটো-চৌকো ও ছোট লেজের পেছনের অংশ লাল। চোখের বৃত্ত হলুদ। ঠোঁট লালচে-কমলা অথবা কোরাল রঙা। ঠোঁটের আগা হলুদাভ। পা ও পাতা কমলা-হলুদ অথবা চকচকে হলুদ। চাপা মিষ্টি কণ্ঠে এরা অনেকটাই নেংটি ইঁদুরের মতো ডাকে। উড়তে পারে দ্রুতগতিতে। পরিবারের সদস্যরা মিলে বা ছোট-বড় দলে চলাচল করে। আকার ও গড়ন-ধরনসহ চালচলনে অনেকটাই বিদেশি পোষা পাখি লাভবার্ডের মতো হলেও এটি আমাদের দুর্লভ আবাসিক পাখি ‘লটকন’ বা ‘ঝুলন টিয়া’।
এরা লেজকাটা টিয়া, পাতাটিয়া, ফুলটিয়া ও জোকার টিয়া নামেও স্থানীয়ভাবে পরিচিত। বসবাস মূলত বৃহত্তর চট্টগ্রাম-সিলেটের পাহাড়-টিলাময় বন ও চা-বাগান এলাকা।

চন্দনা টিয়াঃ
এই পাখিটির ইংরেজি নামের সাথে একজন বিখ্যাত বীরের নাম যুক্ত। সেই বিখাত বীরের নাম হল “আলেকজেন্ডার দি গ্রেট” যিনি গ্রীক বীর হয়ে পৃথিবীর অনেক দেশ বিজয় করেন। আলেকজেন্ডারের নাম অনুসারে এই পাখির নাম করা হয়েছে Alexandrine Parakeet। আলেকজেন্ডার এই টিয়া পাখিটি পাঞ্জাব থেকে ইউরোপ ও ভূমধ্যসাগরীয় এলাকা সহ বহু জায়গায় ছড়িয়ে দেন। এই টিয়া পাখি বিখ্যাত ও সন্মানিত ব্যাক্তিদের রাজকীয় পুরস্কার বা প্রতীক হিসেবে দেওয়ার প্রচলন করেন। ইংরেজিতে এর নাম Alexandrine Parakeet or Alexandrian Parrot এবং যার বৈজ্ঞানিক নাম (Psittacula eupatria) । চন্দনা টিয়া বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ও জনপ্রিয় টিয়া। এটি সারা পৃথিবীর মধ্যেও অনেক বেশী জনপ্রিয় । এর ঠোঁট গাঢ় টুকটুকে লাল। মাথার পিছনে ঘাড়ে ও ডানার উপরের দিকে মোটা লাল দাগ পাওয়া যায়। পৃথিবীতে চন্দনার ৫টি উপপ্রজাতির মধ্যে Psittacula eupatria nipalensis বাংলাদেশে পাওয়া যায়। এটি বর্তমানে বাংলাদেশে খুবই কম দেখা যায়। চন্দনা টিয়া বাংলাদেশের মহাবিপন্ন আবাসিক পাখি।

টিলাগড় ইকো পার্কে পাখি ৪টি অবমুক্ত করে ফেরার পথেই দ্বোহার কাছে ফোন আসে ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী নিখিল চন্দ্র ও তাঁর সঙ্গী মৃত্যুঞ্জয় দে’র । ওরা জিন্দাবাজারে আমাদের পাখি উদ্ধার অভিযান প্রত্যক্ষ করেছে । ওরা জিন্দাবাজার থেকে ফেরার সময় চৌহাট্ট্রাতে সিভিল সার্জন অফিসের সামনের রাস্তায় আরেকজন পাখি বিক্রেতাকে দেখতে পায় । এই বিক্রেতার কাছেও ৪টি টিয়ে পাখি । ওরা পাখি বিক্রেতাকে নজরবন্দী রেখে আমাদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে । দ্বোহা ও নাসির ভাইয়ের অন্য কাজ থাকায় আমি ও বদরুল ভাই চৌহাট্টার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই । ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখি তিনটি চন্দনা টিয়ে । নিখিল জানায় একটি পাখি ইতিমধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে । জনৈক ব্যাংক কর্মকর্তা পাখিটি কিনে মটর সাইকেলে বেঁধে প্রকাশ্যেই চলে গেছেন । আমি আবারো বিভাগীয় বন কর্মকর্তাকে ফোন দেই । তিনি পুনরায় টিলাগড় থেকে ফিরে আসা টিমকে চৌহাট্ট্রা পাঠান । ইতিমধ্যে ফোন করে প্রথম আলোর ফটো সাংবাদিক Anis Mahmud ও সিলেট প্রতিদিনের ফটো সাংবাদিক Mitu Das Joyকে ঘটনাস্থলে আসতে বলি । কিছুক্ষনের মধ্যেই ওরা চলে আসে ।
বন কর্মকর্তারা এসে পৌঁছালে সিভিল সার্জন অফিসের টিলাতে পাখিগুলো অবমুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেই ।সিভিল সার্জন ডা. হিমাংশু লাল রায়’কে পাখি আটক ও অবমুক্ত করার কথা জানালে তিনি উৎসাহের সাথে অফিস কক্ষ থেকে বেড়িয়ে আসেন । পাখি বিক্রেতাকে দেখে তিনি বলেন, এই লোককে একাধিক দিন তিনি দেশীয় পাখি বিক্রি করতে দেখেছেন এবং পাখি বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন । তাঁকে বললেই হ’ল, প্রথমবার নিষেধের পর পরেরবার তাকে আটক করে পাখিগুলো অবমুক্ত করে দেয়াই উত্তম ছিল ।


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত মৃদুভাষণ - ২০১৪
Design & Developed BY ThemesBazar.Com