1. ahmedshuvo@gmail.com : admi2018 :
  2. mridubhashan@gmail.com : Mridubhashan .Com : Mridubhashan .Com

বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৫:৪৩ অপরাহ্ন

আলাপটা ছিল বিয়ের

সাব্বিরুল হক :: কামরুল ইসলাম মামুনের বাড়িতে বিয়ের আলাপ এসেছে এ-নিয়ে আট-দশবার;অন্যান্য বারের মতো খুশি হওয়ারই কথা ওর। এবার হয়ত বিয়ের আলাপটা টিকে যাবে, বড় বোন কানিজের কথা চিন্তা করে মামুনের উৎসাহি হয়ে ওঠার যথেষ্ট কারণ থাকলেও ভাল লাগল না ওর; স্বস্তি, আশাবাদ তো না-ই। খারাপ লাগতে লাগল অনেকগুলো কারণে, যেগুলোর মধ্যে বিশেষ হচ্ছে, সম্বন্ধের আলাপ পাঠিয়েছেন মামুনের বড় চাচা। চাচার পরিচিত, সম্ভবত তাঁর শ্বশুরের দিকে আত্মীয়। আলাপের খবরে অবশ্য বেজায় খুশি হয়েছে বাড়ির সবাই, হতে পারেনি কেবল সে। যদিও যথারীতি চাচা জানিয়েছেন, পাত্রপক্ষ অবস্থাশালী, ছেলে ব্যবসায়ী, বাড়ি-গাড়ি সবই আছে; দেখতে শুনতে ভাল। তবে খুঁত একটাই, বয়স একটু ভারি ছেলের, সেটা কি আর বড় সমস্যা! ওর মনে সন্দেহ খোঁচা দেয় সেখানেই। সবকিছু যার আছে, বয়স হয়ে যাবে কেন তার বিয়ে করার আগেই? তাহলে এমন পাত্রের আসতে হবে কেন এ বাড়িতেই? আর আসতে চাওয়ার ইচ্ছে আরো আগে হলো না কেন? এমনকি মামুনের এমনও মনে হলো, পাত্র কি মানসিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ্য? চাচার কাছে এসব বিষয় জানতে চাওয়া জরুরি। কিন্তু বড়চাচা এমন এক মানুষ, যার কাছে প্রশ্ন তোলা এক কথায় অসম্ভব। বাবার বড় ভাই হিসেবে শুধু না, বড় চাচার দাপটে এপর্যন্ত কাউকে দেখেনি তর্ক করতে, বড়চাচার আদেশ নড়চড় করার সাহস করতে।
মামুন বাবাকেই ফোন করল বাধ্য হয়ে, বিশ বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতার প্রবাসী বাবা।
কি রে বাবু, কথা বলছিসনা যে?
বাবা,তুমি কি খবর পেয়েছো বড়আপার বিয়ের?
শুনেছি। বলেছে তোর মা। কেমন দেখলি? কথা বলেছিস বাবু ওর সঙ্গে?
না, বলিনি। ইচ্ছে হয়নি বলার। আমার মোটেও ভাল ঠেকছিল না বাবা।
কেনো! তোর বড়চাচা পাঠাননি আলাপ? সমস্যা কি তাহলে?
এইজন্যই সমস্যা। ভাল ঠেকেনি বাবা।
কি ভাল ঠেকেনি তোর?
একটা কিন্তু আছে এই আলাপের পেছনে। আমি নিশ্চিত বাবা।
কি রকম কিন্তু?
বড়চাচা নিশ্চয় নিজের কোনো স্বার্থেই এই আলাপ পাঠিয়েছেন।
ফোনের ওপারে মামুনের কথা শোনে বেশ অনেকক্ষণ নিরব থাকলেন ওর বাবা। নিঃশব্দ থাকার কারণ বুঝতে পারা কঠিন। বাবার নিরব চিন্তাধারা, শব্দহীন ভাবনা উদ্ধার করতে পারেনি কখনোই। মামুনকে সীমাহীন জটিলতায় রেখে অনেকটা সময় পরে মুখ খুললেন তিনি, বললেন,‘তুই চিন্তা করিসনা বাবু। আমি তোর বড়চাচাকে ফোন করে করছি। না করে দেবো আলাপটা এখনই।’

আজকাল প্রায়ই মৃত মায়ের জীবিত থাকার প্রয়োজন টের পায় মামুন নতুন করে। সংসারের জন্য মা-র চিরজীবী হয়ে থাকা ওর মনে হয় জরুরি ছিল। মায়ের মৃত্যুর বছর পাঁচেক হয়ে গেল, বদলে গেছে যেনো সব! তাঁর সংসার জীবন সম্বন্ধে শুনেছে মায়ের কাছ থেকেই অনেকবার। বয়স যখন কম মামুনের মায়ের সমস্যা ছিল বেশি আরো। সুন্দর চেহারা, অনেকগুলো অবিবাহিতা ননদ, নানান বয়সের দেবরের দল আর বিয়ের পরপরই অজগাঁয়ে শ্বশুরবাড়ির জীবন, সবমিলিয়ে শুরুর সময় ছিল মায়ের পক্ষে কঠিন। বেড়ে ওঠা শহরে হলেও বিয়ের পর তাঁকে যেতে হয়েছে অজ-গ্রামের শ্বশুরবাড়ী। জনবহুল শ্বশুরবাড়ির বড়বউ হওয়া সমস্যারই। ননদ, দেবর সামলানোর দায়িত্ব বর্তেছে মায়ের ওপর। মায়ের বাবার বাড়ির সংসারে ছিল মেয়েদের প্রাধান্য। শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে পেয়েছেন পুরুষ নিয়ন্ত্রন। সে সময়ে মামুনের বাবার চলছে চাকরি বদলের পালা। একবার এই চাকরি, আরেকবার আরেকটা। ফলে ওর মা’র দ্বিতীয় জীবন শুরু করতে হয় পাড়াগাঁয়ের শ্বশুরবাড়ীতেই। শহরাঞ্চলে বড় হওয়া মেয়ের জন্য বলতে হবে কষ্টকর। তখন নাকি পানির ভাল ব্যবস্থা ছিল না। পুকুরের পানি তুলে নিয়ে রাখা হত, আবার গোসল, কাপড় চোপড় ধোয়া চলত সেই পুকুরেই। বিদ্যুৎ ছিল না, তাই সন্ধ্যা হতেই হারিকেন-কূপি জ্বালিয়ে যতটুকু যা আলো পাওয়া যেত। রাত গভীর হত খুব তাড়াতাড়ি, গ্রামে বলতে গাঁয়েই, গঞ্জেও না। বর্ষাকালে নদীর পানি চলে আসত বাড়ীর নিচে। বর্ষাকালের উপচে আসা জলই যা একটু আনন্দ দিত মামুনের মাকে। শহরে বর্ষার পানি দেখেননি কিন্তু গ্রামের এসে সেই মেয়েই মিশে গেছেন জলমগ্নতার সঙ্গে। প্রথম দিকের সাংসারিক জীবন সহজ না থাকলেও মানিয়ে নিয়েছিলেন আর সব মেয়েদের মতোই।

মায়ের কথা মাথা থেকে সরাতে না সরাতে দেড় বছর পর কাতার থেকে বাড়ি এলেন বাবা, মামুনের মনে হল দেশটাই বিদেশ হয়ে গেছে। পুরো সাতদিন ঠিক মতো কথা বললেন না কারো সাথে, শুয়ে বসে বিশ্রাম নিলেন; তবে ফোনে কথা বললেন ওর বড় চাচার সাথেই কেবল। যতটুকু শুনতে পেল জায়গা-জমি নিয়ে কথা। ওর বড় আপা কানিজের বিয়ের বিষয় নিয়ে কথা হল কি-না বলতে পারবে না। আগের মতো এবারও সোনার জিনিস নিয়ে এসেছেন সঙ্গে করে, ওর বাবার আনা এ সব সোনা-দানা বিপদ-আপদের কাজেই লেগেছে এতোদিন। এগুলো সে জানে, মেয়েদের জন্যই নিয়ে আসেন। সোনার অলঙ্কার, গয়নাপাতি এসব বিয়ের সময় লাগবে মনে করে, কিন্তু লাগেনি আজ পর্যন্ত। মামুনের মা মাঝে-সাজে এটা-ওটা গড়িয়ে আনেন, এমনিতে গয়নাপত্র সব পড়ে থাকে পুরোনো আমলের স্টিল আলমারির ভেতরে। কিন্তু এবার হয়ে গেল ভিন্নতা, সাপ্তাহ ঘুরতেই অবাক হল সে বাবার আচরণে। কাউকে নিয়ে কোনো কথা বলার সুযোগ পায়নি, অনেকগুলো জরুরি ব্যাপারে কিছু বলার চেষ্টা যে করেনি তা-না, বাবা এড়িয়ে যাচ্ছেন কৌশলে, টের পেয়ে কথা তোলার সাহস হয়নি ওর একবারও। অবাক হয়ে গেল বড় বোনের আবার একটা বিয়ের আলাপ এসে পড়েছে দেখে। ওর মন আবারও খারাপ হল; খুশীর জায়গায় খারাপ লাগতে থাকায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল এবং এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়াতে লাগল এলোমেলো, সিগারেট টেনে ফেলল কয়েকটা, কেউ দেখে ফেলার ভয়কে পরোয়া না করেই। ফোন ধরল না কারোরই, বন্ধু-বান্ধব ঘনিষ্ঠদেরও না। এরই মাঝে বড় বোনের বিয়েটা অপ্রয়োজনীয় নাটক মনে হতে শুরু করেছে ওর কাছে। কতো আলাপ এল-গেল, কি হয়েছে তাতে ! এবার কিছু হবে কি-না এই চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়ে মামুন। টার্ম পরীক্ষা দেওয়ার কথা থাকলেও গেল না দিতে। বন্ধু-ক্লাসমেটদের জানিয়ে দিল, যাবে না আজ পরীক্ষা দিতে। বাইক নিয়ে অযথা চক্কর মেরে চলে এল নদীর উপরে ব্রীজে, যেখানে বড় আপা কানিজ ফাতেমা বেড়াতে আসে ওকে নিয়ে হঠাৎ-হঠাৎ।
ঘুরে-ঘুরে ক্লান্তই হল শুধু, ক্ষিধে পেয়ে গেল ওর, বাসায় ফিরে আসলো অজান্তেই আবার। ঘরের দিকে ইতি-উতি তাকিয়ে দেখল, না, সে ঘরে নেই। অভ্যাস বশে ডাক দিল গলা উঁচু করে।
বড়াপা, ও বড়াপা।
কানিজ কোথায় যেন গিয়েছিল। এসে পড়েছে এরই মাঝে। মামুনকে দেখে দূর থেকে জানতে চাইল,‘কি হয়েছে! চেঁচালি কেনো? বাইক কোথায় রেখে এলি শুনি?’
বাইরে রেখে এসেছি ।
গিয়েছিলি কেনো? বাড়িতে মেহমান এসেছেন দেখিসনি?
দেখেছি তো। বুড়া গাধা এক ব্যাটা। বাবা এসেছেন না? আমার কি কাজ তাহলে?
ছি! এভাবে বলছিস কেনো?
আমার ক্ষিধে পেয়েছে বড়াপা।
ক্ষিধে পেয়েছে? তোর! সিগারেট কয়টা খেলি শুনি? পেট ভরে না ওতে?
কে বলেছে সিগারেট খেয়েছি?
নামাজ পড়েছিস বল সত্যি করে? যা গোসল করে নামাজ পড়ে খেতে আয় ।
বড় বোন কানিজের কথা শুনতে হয় সবাইকে, চলতে হয় ওর নিয়মে; এ বাড়ির সবাই উঠে-বসে বড় আপার কথায়, মা মারা যাওয়ার পর থেকে একা হয়ে গেছে, কিন্তু সবকিছু দেখে-শোনে রাখতে হচ্ছে ওরই। এ বাড়ির এক কেন্দ্রিয় নেত্রী সে! ছাত্র রাজনীতি করে না মামুন, করলে নির্ঘাত ওর নেত্রী হতো বড় বোন কানিজ ফাতেমাই। কিন্তু এখন ওর বিয়ের আলাপ চলছে জোরে-শোরে, এবার মনে হচ্ছে পাকাই হয়ে যাবে কথাবার্তা। যেহেতু ওর বাবা এসে পড়েছেন এবারকার আলাপে। কানিজ দেখতে খারাপ না একেবারে, ফর্সা লম্বা, মাথায় অনেক চুল। তবে ছোটবেলায় অসুখে ভুগেছে বলে একটু রোগা ধরণের। বিয়ের আলাপ তো আসে কম হলেও, আতœীয়-স্বজনরাই পাঠান এসব আলাপ। বিশেষ করে বড় চাচা। কিন্তু এখনো চুড়ান্ত হতে পারেনি কোনো কথাবার্তা। এদিকে বাবার বাছাই ক্ষমতা অন্যরকম। সম্ভাব্য পাত্রের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝে ফেলেন সব। অনেক সময় নাকচ করে দেন সরাসরি। প্রবাসী পাত্র এমনিতেই অপছন্দ তাঁর, ফলে আলাপ চলতে থাকে। আর অপেক্ষার পালা বাড়তেই থাকে। মামুন এটাও বুঝতে পারে, বয়স হয়ে যাচ্ছে ওর চেয়ে ছয়-সাত বছরের কানিজের এবং এ-কারণেই বিয়েটা জরুরি! আলাপ-সালাপ নিয়ে মাথাব্যথা কমই আছে একটু কানিজের। অবশ্য মাঝে-মাঝে জানতে চায়,‘কেমন দেখলি লোকটাকে?’
মামুন জানায়, ‘ফালতু বাজে লোক বড়াপা। একদম কালো, তোর চুলের মতো। দাঁত বের করে হাসে, চটকানা মেরে বিদায় করে দিতে ইচ্ছা হয়। কোথা থেকে যে আসে এগুলো?’
মামুনের কথার ধরণে অবাক হয়ে কানিজ বলে, ‘ছি, এভাবে কথা বলতে আছে রে? মা থাকতে তো এ রকম করে কথা বলতে শুনিনি তোকে!’
মাস্টার্স পাশ করেছে অনেকদিন হয়ে গেছে, বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন হয় না তেমন। ঈদের সময় কেনা-কাটা আর আতœীয়-স্বজনের বিয়ে, মৃত্যু ছাড়া অন্য কোথাও যাওয়া হয় না কানিজের।ওর বান্ধবীর সংখ্যা খুব কম, কোনো বন্ধু নেই, তাই ভাই-বন্ধু বলতে মামুন শুধু। অনেক রাতে, রাত জেগে গল্প করে ও, ঘুম না আসলে বাইরের ঘরে এসে দাবা খেলে ছোট ভাইয়ের সঙ্গে। বড় আপার রান্না পৃথিবীর সেরা, বাইরে কোথাও গেলে পার্থক্যটা বুঝতে পারে মামুন বেশি করে। বাড়ির বাইরে সচরাচর খায় না কিছু। কড়া নিষেধ আছে। যেখানে যা কিছু করে না কেন, খাওয়ার সময় হলে ফিরে আসে ঠিকই। এসেই চেঁচামেচি জুড়ে দেয়, ‘ক্ষিধে লেগেছে বড়াপা, ভাত খাবো।’

দেশে এসে প্রথম কিছুদিন সুস্থির হওয়ার পর বাবাকে অস্থির হয়ে যেতে দেখতে পেল মামুন। যেনো দেশের সবকিছু বিরক্ত করে চলেছে তাঁকে। কারণে-অকারণে রেগে উঠতে দেখা গেল বাবাকে, মামুনকে সামনে পেলে কষে ধমক মেরে দিতে শুরু করলেন।
কি এতো ঘুরাঘুরি করো সারাদিন?
ক্লাস আছে বাবা।
সারাজীবন তো ক্লাস করে গেলা! আয় রোজগার করবা কবে?
এবছরই ফাইনাল । শেষ হয়ে যাবে এমবিএ । ছয় মাস লাগবে আর ।
তুমিই জানো তোমার কি পড়া! আমরা কি আর পড়েছি নাকি এতো? আমাদের পড়তে হয় নাই এতো বইপত্র। যেখানে পড়েছি সেখান থেকে টাকা নিয়া বাড়ি আইছি। আর তুমি উল্টা টাকা নিয়া যাও প্রত্যেক মাসে!’
শেষ করে চাকরী নেবো।
সেই আশায় থাকি আর কি! এক কাজ করো, আজকে বাসায় থাকো । সন্ধ্যার পর কানিজকে দেখতে আসবে। আজকে পাকা করে ফেলতে হবে কথাবার্তা। আর দেরি করা ঠিক অইবো না বুঝলা?
ঘটনা হলো একটু ব্যতিক্রম। পাত্রপক্ষের অবস্থা ভাল; ছেলে ব্যবসায়ী, গাড়ি-বাড়ির মালিক। দেখতে শুনতেও বাবার পছন্দ হয়ে যাওয়ায় কথা পাকা করে ফেললেন, ছেলে আংটিও পরিয়ে দিলো। সেই সাথে দিয়ে গেল পাত্রী দেখার সম্মানীর টাকাও। দিন তারিখ ঠিক করে ফেলবে কয়েক দিনের ভেতর, জানিয়ে গেলেন ছেলে পক্ষের মুরুব্বিরা। মামুনের জন্য অশান্তির হল গোটা ঘটনাটা আবারও, এ কারণে যে, আলাপটা এসেছে ওর বড় চাচার মাধ্যমেই। বড় চাচার ব্যাপারটা বরাবরই অদ্ভূত। কিছুদিন আগে বাড়িতে এসে বেড়িয়ে গেছেন বড়চাচা, তিনবছর আগে এসেছিলেন একবার। মামুনকে ডেকে নিয়ে জানতে চাইলেন অনেক কিছু। কথা শেষ হয় না চাচার, প্রশ্ন আসে একের পর এক। বেশিরভাগই পরিবারের একেবারে ভেতরকার, যে বিষয়গুলোর সঙ্গে আপন চাচা তেমন সম্পর্ক নেই। ওদের পরিবারে কোনোদিনই অবদান রাখেননি বড়চাচা।
তোর বাপে কি টাকাপয়সা পাঠায় ঠিকমতো?
জ্বী, পাঠান।
কয় টাকা পাঠায় মিডিলইষ্টের দেশ থেকে?
প্রয়োজন মতো পাঠান। আমাদের চলে যায়।
সংসারে খরচের তো শেষ নেই। তোরা এতগুলো ভাই বোন ! পড়ালেখা হচ্ছে তোদের ঠিকঠাক?
করছি চাচাজান। দোয়া করবেন।
দোয়া কি আর করি না। কিন্তু তোর বাপটা যেন কেমন। আমাদের খোঁজখবরটা নেয় না পর্যন্ত। ফোনও দেয় না। জানতেও চায় না বেঁচে আছি না মরে গেছি। অবশ্য তোদের খবর তো নেয় কি বলিস?
আপনাদের খবরও নেন আমার কাছ থেকে।
অবাক কথা শুনালি। তোর বাপকে বলিস তো আমাকে ফোন দিতে। পারবি না বলতে? নাকি বাপের মতো তুইও ভুলে যাবি?
জি,¡ কথা হলে বলবো ফোন দিতে।
‘বাড়িতে তো যাস না তোরা। জায়গা জমির মনে হয় দরকার নাই আর, নাকি?’
‘সময় পাই না চাচা।’ মামুন জবাবদিহী করে,‘বাবা আসলে যাবো হয়ত।’
তোর বাপ কি বিক্রি করে ফেলতে চায় নাকি জমি-জিরাত? বুঝলি কিছু?’
বলতে পারলাম না চাচা। জমির বিষয় বাবাই ভালো বুঝবেন।
মামুনের কথায় বড় চাচা কুটিল হাসলেন। জানতে চাইলেন,‘বোনের বিয়ের চেষ্টা-চরিত্র করছিস কিছু? নাকি বসে অছিস ঘরে নিয়ে? এখনকার দিনে ছেলে খুঁজে আনতে হয়, জানিস এটা?’
এ কথায় মামুন উত্তর দিতে পারে না, হাতে এমন কোনো তথ্য পায় না খুঁজে যা দিয়ে চাচার প্রশ্নের সদুত্তর হতে পারে, ভীষণ এক দুর্বলতা বোধ করতে থাকে সে, চাচা বুঝতে পারেন মনেহয়, বাঁকা হাসেন ওর নামিয়ে নেয়া মুখের দিকে চেয়ে!

দিন এগোয় আর ওর অশান্তি বাড়তে থাকে, মামুন স্থির হতে পারে না কিছুতেই। বড় আপা কানিজের সঙ্গে একই বাড়িতে থেকে, খেলে বড় হয়েছে সে। মার খেয়েছে অনেক ওর হাতে। পড়তে বসে পিটুনির ভয়ে ভান করেছে পেট ব্যথার, জ্বরের। ক্ষিধে পেলে খাবার চেয়েছে ওর কাছেই সবসময়! এ নিয়ে বিয়ের আলাপ তো কম এলো না। বিষয়টা আবারও ভীষণরকম অস্বস্থিতে ফেলে দেয় মামুনকে, ভাবনা-চিন্তা অবশ হয়ে আসতে থাকে ওর। রাতের দুঃস্বপ্নে না, জেগে থেকেই কোথাও একটা কালো ছায়া দেখতে পায় কেন বুঝতে পারে না সে! জায়গা-জমি নিয়ে বড় চাচার কথাবার্তা কোনোদিনই ভাল লাগেনি ওর কাছে। বাবা বিদেশ যাওয়ার পর চাচা যেনো উঠেপড়ে লেগেছেন এ নিয়ে। মায়ের সঙ্গে শেষের দিকে চাচার সম্পর্ক সহজ ছিল না। তাঁর ছেলের জন্য কানিজকে নিতে চেয়েছিলেন। মা রাজি হননি। বড় চাচার রাগ-জেদ আছে এ নিয়ে, বুঝতে পারে মামুন।

মৃত মায়ের সংসার জীবনের কথা মনে পড়ে যায় ওর।
একান্নবর্তী শ্বশুর বাড়িতে বড় বৌয়ের দায়িত্বের বোঝা কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। ব্যাপক দায়িত্ব ছিল সেসব। হাওরের বিশাল আকারের মাছ কাটা থেকে শুরু, আরো বিশাল রান্না এবং লোক খাওয়ানোর আয়োজন সবই করতে হয়েছে তাঁকে একা। এসব গল্পই মনে হয়েছে মামুনের। বাবার কাছেও শুনেছে অনেকবার। ওর মা তেমন কথা বলতেন না। শ্বশুরবাড়ির স্মৃতি খুব একটা ভাবাত বলেও মনে হয়নি ওর। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মামুনের বাবার জুট মিলের চাকুরীতে যোগ দেয়ার আগ পর্যন্ত ওর মা আসলে ছিলেন গ্রামেই অন্তরীণ। অভ্যস্থ হয়ে পড়েছিলেন গ্রামের দিনযাপনে। ওইসময় এক বর্ষায় কঠিন অসুখে পড়েন তিনি। পানি বাহিত অনেক রোগের প্রাদুর্ভাব তখন গ্রামদেশে। বুক পিঠের ব্যথা তখন থেকেই শুরু, পরে কিছুদিন পেটের অসুখে ভুগতে হয়েছিল তাঁকে। মামুনের বাবা চা বাগানের চাকরিতে সময় পেতেন খুব কমই। সিলেটের শ্রীমঙ্গলে যে বাগানে থাকতেন, অনেক দূরের পথ ছিল, আসতে যেতেই পার হয়ে যেত দু’দিন। আসতেন বছরে দুই ঈদে বা লম্বা ছুটি পেলে। কানিজের জন্ম দাদার বাড়িতে। বড় চাচার পরিবারে কেটেছে ওর খুব ছোটবেলা। ছোট থাকতে পুকুরের পানিতে ডুবে যাওয়া থেকে বেঁচেছে কয়েকবার। এসব সবই শোনা কথা, পুরনো গল্প হয়ে গেছে। মামুনের মনে পড়ল মায়ের জন্যই। মা জীবিত থাকলে হয়ত কানিজের বিয়ের একটা সুরাহা হয়ে যেত এতদিনে।

কানিজের বিয়ে ঠিক হয়ে যাওয়ার পর মামুন ভেবে পায় না কি করে উঠবে! আবারও এখানে-সেখানে এলোপাতাড়ি ঘুরে বেরিয়ে মনখারাপ করা ছাড়া আর কি করতে পারে সে? পড়াশোনাও শেষ হয়নি, না হয় মেতে থাকত চাকরী নিয়ে! বাবার কাছে গুরুত্বটা বাড়ত কিছু হলেও। মামুন নিজের মনে স্বস্তি আনতে পারলনা সারারাতে। কেনো যেন ওর মনে হতে লাগল এ বিয়ে হবে না, এমনকি হতে দেওয়াও ঠিক হবে না।
রাতে এপাশ-ওপাশ কাটিয়ে সকালে উঠে কি মনে হল কে জানে, অনেক দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়ে ভাবল যা হয় হবে, একবার দেখতে হবে গিয়ে হবু পাত্রকে। ওর অফিসের কার্ড দিয়ে গিয়েছিল, মামুন ওর বাবার কার্ডহোল্ডার থেকে কৌশলে বের করে নিয়ে ঠিকানা দেখল। না, খুব দূরে না, পাত্রের অফিসের এলাকা ভালই চেনে।
কি মনেকরে কার্ডটা পকেটে নিয়ে বাইকে চাপল মামুন।
ওখানে যেতে আধঘণ্টাও লাগল না, অফিসেই আছে সে, পেয়ে গেল সহজে, ওকে দেখে হবু পাত্র হৈ-চৈ করে উঠল। অঙ্গভঙ্গি করে রসিকতাও করল। দেখে মামুনের গা জ্বলে যায়, কথা বলে না সে এববারও।
হেসে চেঁচিয়ে উঠল পাত্র,‘বড় কুটুম্ব যে! অবাক হবার ভান করল সে, তারপর কি মনেকরে আসলে? তর সইছে না বুঝি!’
রাগে মামুনের হাত-পা ঝলসে গেল, মনে মনে গালি দিল হবু ভগ্নিপতিকে। খুব খারাপ ধরণের কয়েকটা।
অনেক সহ্য করা গলায় বলল,‘আপনার সঙ্গে জরুরি কথা আছে।’
চলো, চেম্বারে চলো। হাজার কথা শুনবো তোমার। তুমি হলে হচ্ছো আমার শা….
লোকটার কথাবার্তা শুনে পা নিশ-পিশ করে মামুনের। আবারও গাল পাড়ে মনে মনে, নিজেকে সামলে নেয় অবাক করা ধৈর্য্যে। চেম্বারের ভেতরে গিয়ে বসে মামুন খুঁজতে থাকে কিছু একটা এবং পেয়েও যায়। এক কোণে দেয়ালে বিদেশি র‌্যাকে রাখা সুদৃশ্য ক্যান আর বোতলগুলো চোখ কেড়ে নেয় মামুনের। নেশা-পানীয় তাহলে চলে ভালই, ভেবে নেয় সে। সফল ব্যবসায়ীই তাহলে হবু ভগ্নিপতি? সিদ্ধান্তটা খুব দ্রুতই নিতে হয় ওর। ধন্যবাদও দিয়ে দেয় মনে মনে নিজেকে।
শুনেন ভাই, আপনি লোকটা রামছাগল, বুঝলেন?
কি বললে? লাফ দিয়ে যেন ছাদে উঠে যায় ভগ্নিপতি, কি বলতে চাও তুমি …
বলতে চাই, আপনি একটা ছাগল। জানেন কাকে বিয়ে করতে গেছেন? চেনেন ওকে?
না। চিনবো কেনো? তোমার বড় চাচা কথা ঠিক করে দিয়েছেন বিয়ের …
তুমি মিয়া একটা ভাদাইম্যা …
কি ! কেনো, কি হয়েছে?
আমার বোনকে চেনো তুমি? মাইরা ভজকাইয়া ফালাইবো তোমারে। আগেও অনেকরে পিটাইছে। তুমি গেছো ওরে বিয়া করতে?
কি বলছো এসব! মানে কি এসবের? ওরে বাপরে, আমি তো কিছুই জানিনা। আমি তো ভদ্রলোক ভাই …
আমি বলছি নাকি তুমি অভদ্রলোক? বলেছি ছাগল। ভাদাইম্যা। এখন দেখছি আস্ত একখান বলদ!
ভাই মাফ চাই। আমি নাই এসবে। আমার দরকার নাই ভাই এমন বিয়ের। আমি আজই আলাপ ফিরিয়ে নিচ্ছি … ওরে বাপরে …
ঠিক আছে। তবে আমি কিছু বলছি বলে বলবে না যেন। তাহলে খবর আছে তোমার।
কথা বাড়ায় না আর, বাইক নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে আসে মামুন।

কানিজকে নিয়ে যেসব জায়গায় বেড়াতে বেরুতো, সে সব জায়গায় ঘুর-ঘুর করে ক্লান্ত হয়ে পড়ে আবার। ক্ষিধে পেয়ে যায় ওর। সিগারেটের নেশা চাপে প্রচন্ড, কিন্তু না সিগারেট ধরার সাহস করে না আজ, কানিজের নিষেধ আছে। সে চায় না ছোটভাই মামুন আজে-বাজে কিছু খাক-যদিও জানে মামুনের সিগারেটের নেশার কথা; তবে জানে না যে দুশ্চিন্তার গভীর রাতে আকাশ দর্শনের সাথে নেশাটার সম্পর্ক।

বাইক থামিয়ে দোকানের ফ্রিজ থেকে পানি খায় মামুন। ঠান্ডা এক লিটারের বোতল একটানে শেষ করে আরো বেশি তেষ্টা লাগে ওর। বুঝতে পারে পানি খেতে হবে বাসায় গিয়ে। বাইকটা ওখানে রেখেই হাঁটতে থাকে সেদিকেই। বাসায় গিয়ে গোসল করে নামাজ পড়ে নেয় সে।
‘কি রে বাইকটা আবার কোথায় রেখে এলি!’ জানতে চায় কানিজ রোজকার মতো।
বাইরে। পানি খাবো বড়াপা, ঠান্ডা পানি আছে ফ্রিজে?
ঠান্ডা পানি খেতে হবে না। গোসল হয়েছে?
হ্যাঁ
নামাজ?
পড়েছি তো!
ভাল ছেলে।’ সুস্থির দেখায় কানিজকে। বহুদিন পর পরীক্ষায় ভাল ফলাফল শোনার মতো মুখোভঙ্গি দেখা দেয়। অনেকদিন পর মুখভরা হাসি দেখতে পায় মামুন বড় বোনের মুখে। কানিজ বলে,‘আয় বাবু, খেতে আয় তাড়াতাড়ি। হাতে অনেক কাজ আমার, জানিস তো?’


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত মৃদুভাষণ - ২০১৪
Design & Developed BY ThemesBazar.Com