1. ahmedshuvo@gmail.com : admi2018 :
  2. mridubhashan@gmail.com : Mridubhashan .Com : Mridubhashan .Com

সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০২:৪৩ পূর্বাহ্ন

বড়লেখায় কলেজছাত্রের মৃত্যুতে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন

লিটন শরীফ, বড়লেখা (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি :: মৌলভীবাজারের বড়লেখায় মেধাবি কলেজ ছাত্র প্রান্ত দাসকে (১৮) হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠেছে। প্রান্তের পরিবার ও সহপাঠীরা এমন অভিযোগই করছেন। সে উপজেলার বর্ণি এম মন্তাজিম আলী কলেজের একাদশ দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিল। তাঁর পরিবারের অনটনের কারণে বর্ণি ইউনিয়নের মিহারী নয়াগ্রামের পিসির (ফুফু) বাড়িতে থেকে সে লেখাপড়া করত।

গত বুধবার (৩১ অক্টোবর) সকালে ওই বাড়ির পরিত্যক্ত রান্নাঘরের জানালার গ্রিলের সাথে মুখ বাঁধা ও দ-ায়মান অবস্থায় তাঁর লাশ পাওয়া গেছে। পিসির বাড়ির লোকজনের দাবি গত সোমবার (২৯ অক্টোবর) রাত থেকে থাকে পাওয়া যাচ্ছিল না। হঠাৎ সে নিখোঁজ হয়ে যায়।

কিন্তু উদ্ধার করা প্রান্তের লাশের বিবরণ অনুযায়ী সবার ধারণা এটি আত্মহত্যা নয়। পরিকল্পিত হত্যাকান্ড। এটিকে কোনোভাবেই আন্তহত্যা মানতে নারাজ তাঁর পরিবার, সহপাঠি ও এলাকার লোকজন। তাদের দাবি পিসির বাড়ির লোকজন তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা পর লাশ ঝুলিয়ে রেখে আত্মহত্যার নাটক সাজিয়েছেন।
অন্যদিকে বুধবার ভোররাতের দিকে প্রান্তের মুঠোফোন থেকে বন্ধু ও স্বজনদের কাছে পাঠানো কয়েকটি ক্ষুদেবার্তা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে রহস্য। প্রান্তের কলেজের সহপাঠিরা জানিয়েছে, সে সব সময় ইংরেজিতে এসএমএস করত। কিন্তু ওই রাতে তাঁদের কাছে আসা এসএমএসগুলো ছিলো বাংলাতে। এতে করেই তাঁদের সন্দেহটা আরো গভীর হয়। যে এটা হত্যাকান্ড।

বুধবার ভোররাতে প্রান্তের মুঠোফোন থেকে সহপাঠি অনিকের মুঠোফোনে একটি ক্ষুদেবার্তা পাঠানো হয়। তাতে লেখা ছিল, “বন্ধুরা তরা সবাই ভালো থাকিছ। হয়তো তোদের সাথে আমার আর দেখা হবে না। কিন্তু তোদের সাথে কাঠানো সময় গুলো পরকালে আমার মনে থাকবে।” একই রকম একটি ক্ষুদেবার্তা যায় তাঁর কলেজের সহপাঠিদের নিয়ে তৈরি করা গ্রুপ “বন্ধুদের ক্যাম্পাস” এ। এই ক্ষুদেবার্তর শেষে “বিদায়” লেখা ছিল।

এদিকে প্রান্ত আত্মহত্যা করেনি, তাকে হত্যা করা হয়েছে-এমনটা দাবি করে তাঁর সহপাঠিরা ঘটনার মূল রহস্য উদ্ঘাটন এবং এর সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে গত চারদিন ধরে তাঁর সহপাঠিরা ক্লাস বর্জন করে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে।

সরেজিমনে গত শনিবার (০৩ নভেম্বর) বর্ণি ইউনিয়নের মিহারী নয়াগ্রাম এলাকায় গিয়ে কথা হয় প্রান্তের সহপাঠি এম মন্তাজিম আলী কলেজের শিক্ষার্থী অনিক দাসের সাথে। অনিক বলেন, ‘প্রান্ত আর আমি একসাথে ক্লাস সেভেন থেকে পড়েছি। বুধবার ভোররাতে ৩টা ১৩ মিনিটের দিকে আমার কাছে একটি মেসেজ আসে। এটা বাংলায় লেখা ছিল। কিন্তু সে ইংরেজিতে মেসেজ লিখত। এটা তার লেখা নয়। নিশ্চই খুনিরাই মেসেজ পাঠিয়েছে। সে খুব ভালো ছেলে ছিল। সবসময় হাসিখুশিতে থাকত। কারো সাতে তার কোনো শত্রুতা নাই। এরকম ছেলে আত্মহত্যা করতে পারেনা। তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমরা এঘটনার উপযুক্ত বিচার চাই। আমাদের সহপাঠিরা ক্লাস বর্জন করেছে। কেউ ক্লাসে যাচ্ছে না।’

শনিবার (০৩ নভেম্বর) বিকেলে প্রান্তের বাড়ি উপজেলার সুজানগর ইউনিয়নের বাঘমারা গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, প্রান্তের বাবা-মা বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে আছেন। ছেলে প্রান্তের এমন মৃত্যুতে তাঁরা ভেঙে পড়েছেন। এসময় কথা হয় প্রান্তের মা চ লা রানী দাস এর সঙ্গে। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, আমাদের অভাবের সংসার। স্বামী (সনত দাস) স্ট্রোক করেছেন। চলতে পারেন না। আগে পাটি বিক্রি করে সংসার চালাতেন। পরিবারের ৫ ছেলে মেয়ে রয়েছে। এরমধ্যে প্রান্ত তৃতীয়। প্রান্ত সিক্স পর্যন্ত পড়েছে। পরিবারে অস্বচ্ছলতার কারণে আমার ভাগ্নেরো (প্রান্তের ফুফাতো ভাই) তাকে পড়ানোর কথা বলে তাদের বাড়িতে নিয়ে যান। প্রান্ত পড়াশোনার পাশাপাশি আমার ভাগ্নের দোকানও দেখাশোনা করতো। গত সোমবার সুমনের ভাই সুজন ফ্রান্স থেকে ফোন করে বলে, মামি প্রান্তকে নিয়েছিলাম ভালোর জন্য, পড়াশোনা করবে বলে। এখন তার স্বভাব চরিত্র খারাপ হয়ে গেছে। আমার বড় ভাইয়ের (সুমনের) বউয়ের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করছে। আমি তাকে বললাম আগামীকাল সকালে প্রান্তকে বাড়িতে নিয়ে আসবো। তখন সুজন বলে, আমি প্রান্তের সঙ্গে গত রোববার কথা বলেছি। তাকে বকাবকি করেছি। বলেছি যদি আমি বাড়িতে থাকতাম তাহলে “কেটে বস্তায় ভরে নদিতে বাসিয়ে দিতাম।” ওইদিন রাতে আমার বড় ছেলে ঘটনাটা জেনে প্রান্তকে আনতে যায়। এরপর থেকে প্রান্তের কোনো খোঁজ মেলেনি। খোঁজে না পেয়ে পরদিন মঙ্গলবার আমার ছেলে শুভ থানা পুলিশকে জানাতে চেয়েছিল। কিন্তু সুমন তাকে জানাতে বারণ করে বলেছে এটা পারিবারিক সমস্যা। তোমার ভাই আর আমার বউ। আত্মীয়-স্বজন আর লোকজনে শুনলে শরম। পরে আমার ছেলে থানায় আর জানায়নি। মঙ্গলবার রাতে আমার ভাগনি (সুমনের বোন) ফোনে শুভকে জানায় প্রান্ত আমার মোবাইলে মেসেজ ‘বিদায়’ লিখে পাঠিয়েছে। এটা সে কেন দিল। এরপর তার মোবাইল ফোন বন্ধ ছিল। বুধবার সকালে সুমন আমার ছেলে শুভকে ফোন করে জানায় প্রান্ত গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। খবর পেয়ে আমার ছেলে দ্রুত সেখানে গিয়ে দেখে একটি ভাঙা করে দাঁড়ানো অবস্থায় তাকে পায়। তারা নিরপরাধ ছেলেটা হত্যা করেছে। এখন আত্মহত্যার নাটক সাজাচ্ছে।’

প্রান্তের বড়ভাই শুভ দাস বলেন, ‘আমার ভাইকে ফুফাতো ভাইয়েরা মিলে খুন করেছেন। এটা এখন নিশ্চিত। তারা পরিকল্পিতভাবে আমার ভাইকে খুন করেছে। আমার এখন মামলা করব তাদের বিরুদ্ধে।’

বর্ণি ইউনিয়নের মিহারী নয়গ্রামের বাসিন্দা প্রান্তের পিসিতো ভাই সুমন দাস বলেন, ‘একজনের ছেলে মারা গেছে। স্বাভাবিক প্রথম অবস্থায় অনেক অভিযোগ উঠানো হবে। ঈশ্বর ছাড়া কেউ জানে না। প্রকৃত ঘটনাট কি। সপ্তম শ্রেণী থেকে সে আমার বাড়িতে। ওখানে থেকেই লেখাপড়া করত। হঠাৎ সে ঘর থেকে নিখোঁজ হয়। বিষয়টি মামার বাড়িতে জানাই। এরপর বুধবার তাঁর লাশ পাওয়া যায়। সে আহত্মহত্যা করেছে না কেউ তাকে খুন করেছে এটা আমরা জানিনা। যদি তাকে কেউ হত্যা করে তাকে তবে আমরা তার বিচার চাই।’

এম মন্তাজিম আলী কলেজের অধ্যক্ষ আসুক আহমদ রবিবার (০৪ নভেম্বর) মুঠোফোনে বলেন, ‘প্রান্ত কখনও আত্মহত্যা করতে পারেনা। লাশ দেখে এলাকার অনেকেই বলেছেন, তাকে হত্যা করা হয়েছে। আমরা সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিচার চাই। ঘটনার রহস্য উদঘাটনের দাবিতে শিক্ষার্থীরা চারদিন ধরে ক্লাস বর্জন করে যাচ্ছে। তাদেও কোনোভাবেই ক্লাসে ফেরানো যাচ্ছে না।’

বড়লেখা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. ইয়াছিনুল হক বলেন, ‘লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়। প্রান্তের পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে অপমৃত্যু মামলা রজু হয়েছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া গেলে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত মৃদুভাষণ - ২০১৪
Design & Developed BY ThemesBazar.Com