1. ahmedshuvo@gmail.com : admi2018 :
  2. mridubhashan@gmail.com : Mridubhashan .Com : Mridubhashan .Com

মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২০, ০৬:৫৯ অপরাহ্ন

শিরোনাম :
ঢাকায় সৈয়দ মুক্তাদিরের প্রথম জানাজা, হেলিকপ্টারে লাশ মৌলভীবাজারের পথে রুশ হামলায় তুর্কি সমর্থিত ৭৮ বিদ্রোহী নিহত দোহা বিমানবন্দরের বাথরুমে নবজাতক, অতঃপর… হাজী সেলিমের বা‌ড়ি থে‌কে অস্ত্র, মদ-বিয়ার ও ওয়া‌কিট‌কি উদ্ধার সৈয়দ আব্দুল মোক্তাদির এর মৃত্যুতে জালালাবাদ এসোসিয়েশনের শোক নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্টকে মারধর, সংসদ সদস্য হাজী সেলিমের গাড়িচালক গ্রেফতার সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, টোকন ঠাকুর গ্রেফতার চট্টগ্রামে ফিরেছে বৈরুত বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত যুদ্ধজাহাজ বিজয় মাদক কিনতে গিয়ে গ্রেপ্তার অভিনেত্রী প্রীতিকা সৈয়দ আব্দুল মোক্তাদিরের সুস্থতার জন্য দোয়া চেয়েছে জালালাবাদ এসোসিয়েশন

একজন হোসেন আলী

হাসান তানকিউল

হাসান তানকিউল :: “হোসেন আলীর ” গল্প আমার এক বন্ধুর কাছ থেকে শোনা । আমার হাতে গোনা কিছু বন্ধু আছে যাঁদের গল্প আমি খুব আগ্রহ নিয়ে শুনি। এ গল্পটিও সে রকমের। বন্ধুটি আমাকে এ গল্প শোনানোর পর আমি তাকে গল্প বিষয়ক নানান খুঁটিনাটি প্রশ্ন করতে শুরু করলাম , তার কারণ প্রায় দেড় বছরে ঘটে যাওয়া ঘটনা সে তিন মিনিটে আমাকে বলে ফেলেছে । গল্পকার হিসেবে অতি জরুরি যে সব তথ্যের আমার প্রয়োজন তা তার কিছুই নেই !

তাকে বললাম , এই লোকের সাথে দেখা করা কি সম্ভব হবে ?

সে খানিক্ষন কি যেন ভাবল, সে চশমা ওলা ভাবুক টাইপের মানুষ ! আমাকে বলল , তুই যদি এ রবিবারে নিউ জার্সিতে আসতে পারিস তাহলে তোকে হোসেন আলীর সাথে দেখা করিয়ে দেব।

এখন সমস্যা হচ্ছে রবিবার আমার একমাত্র সাপ্তাহিক ছুটির দিন। এ দিনটাতে আমি পারতে বাসা থেকে বের হই না তার কারণ হলো আমার পেশাটাই হচ্ছে ঘুরাঘুরি করা সারাক্ষনতো বাইরেই থাকি । ছুটির দিনে আমি পুরোপুরি ঘরকুনো মানুষ নিজের একান্তে কিছুটা সময় কাটাই , লেখালেখি করি , কীবোর্ড বাজাই আমার ব্যক্তিগত ওয়েটার (স্ত্রীকে) এটা ওটা রাঁধতে বলি । ইদানীং আমি সমাজ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন এক মানুষে পরিণত হয়েছি। আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধবের বাড়িতে যাওয়া , দাওয়াত খাওয়া এসব আমার ধাতে নেই বললেই চলে। তাছাড়া মানুষ হিসেবে আমি চরম অসামাজিক ! যদিও নিজের অন্তর্জলে আমি মেলা সময় দিই । আপনারা হয়ত শুনলে অবাক হবেন , আমার শ্বশুর বাড়ি যেখানে গাড়ি করে গেলে মাত্র দশ মিনিট লাগে সেখানেও আমি গত তিন বছরে তিনবার গিয়েছি বলে মনে পড়ে না আর এতো কোথাকার কোন হোসেন আলী !

তারপরও গল্পের টানে আমি ঝুম বৃষ্টির মধ্যে এক রোববার দুপুরবেলায় গাড়ি চালিয়ে গেলাম নিউ জার্সিতে । হোসেন আলীর সাথে দেখা হল। হালকা পাতলা গড়নের অতি সাদামাটা চেহারার কৃষ্ণবর্ণের একজন মানুষ , মাথা ভরতি মিশমিশে কালো কোঁকড়া চুল , বিশেষত্বহীন চেহারা তবে হাসিটা সুন্দর। হাসলে মুক্তোর মতো ঝকঝকে সাদা দাঁতগুলো চোখে পড়ে। ভদ্রলোক সমাজ সেবক । বাড়ি সুনামগঞ্জের ভাটি অঞ্চলে।

সেখানে এ বছরের বন্যায় বোরো ফসলের প্রচুর ক্ষতি হয়েছে । গরিব কৃষকদের জীবন কাটছে অনিশ্চয়তায় আর হতাশায়। হোসেন আলি ফান্ড রেজিংয়ের আয়োজন করেছেন। নিম্নবিত্ত , মধ্যবিত্তের লোকজন এগিয়ে এসেছেন তবে বিত্তবান কাউকে দেখলাম না। বিত্তবানরা ব্যস্ত থাকুন নিজেদের বিত্ত নিয়ে ।

আমরা গল্পে ফিরে যাই।গল্প শুনতে এসেছি এ কথা শুনে হোসেন আলী বেশ অবাক হলেন । আমার বন্ধু আবার আমাকে লেখক(!) বলে পরিচয়ও দিয়েছে। আমি লেখালেখি করি এ কথা শুনে তিনি বললেন

“ আপনের এখন পর্যন্ত কয়টা বই বের হয়েছে ?”

আমি হেসে বললাম, একটাও না । আমি আধুনিক যুগের লেখক। ফেসবুকে লেখি । ফেসবুক আমার প্রকাশনী। ওয়ান ক্লিক প্রকাশনা !

উনি তা শুনে হেসে বললেন , ভাই সাহেব চলেন আমার বাসায় এইখানে কাজ শেষ ।

আমি তাঁকে জিগ্যেস করলাম কত টাকা উঠেছে ফান্ড রেজিংয়ে ?

উনি হাসিমুখে বললেন ৩৭০০ ডলার । আলহামদুলিল্লাহ । তাঁর কথার মধ্যে তৃপ্ততার আভাস পেলাম ।

উনি বললেন , চলেন গাড়িতে গিয়া উঠি মনে হয় বৃষ্টি শুরু হইবে । লোকটার ব্যবহার আন্তরিক। সহজ সরল একজন মানুষ।

হোসেন আলি সাহেবের বাসায় যেতে বেশিক্ষণ লাগলো না কাছেই থাকেন পৌঁছনো মাত্রই ঝম ঝম করে বৃষ্টি শুরু হল , উনি আমাদের দুজনকে তাঁর বাড়ির ড্রইংরুমে বসালেন, বসিয়েই ভেতরে চলে গেলেন । ফিরলেন তিন কাপ চা নিয়ে। আমার দিকে চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে বললেন ,

বুঝলেন ভাই সাহেব , বৃষ্টি বাদলার দিনে চা খেয়ে খেয়ে গল্প করার মজাটাই অন্যরকম ! এটা আমি শিখেছি আমার স্ত্রীর কাছ থেকে । তার চায়ের নেশা ছিল মারাত্মক ! এ কথা বলে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন আপনে পা তুলে আরাম করে বসেন আমার গল্প অনেক লম্বা !

তার কথামত আমিও পা তোলে আরাম করে বসলাম । তার বসার ঘরের জানালাটা প্রকাণ্ড। বাইরে তুমুল বৃষ্টি তার ছাট এসে জানালায় পড়ছে। নিউ জার্সির আকাশে তখন সন্ধ্যার নীলাভ আলো । গল্প শোনার সুন্দর পরিবেশ !

শুরু হল তার গল্প । চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন আমি আমেরিকায় আসি ১৯৯৩ সালে । আমেরিকায় আসার আমার কোন কথা ছিল না । আমি গ্রামের ছেলে । গ্রামেই জন্ম , স্কুল , কলেজ সবকিছু । আমার চৌদ্দগুস্টির কেউ বিদেশে যায় নাই । সবাই মিইল্যা গ্রামে থাকি । আমার বাবা /চাচারা গৃহস্ত । ধান বিক্রি কইরা সংসার চলে । আমাদের যৌথ পরিবার ।

যখন আমি বিএ প্রথম বর্ষে পড়ি তখন আবার ডিভি লটারিতে আমেরিকা আসার ধুম পরছে । সবাই আমেরিকা আসতে চায় ! এইখানে আপনারে একটা কথা বলি আমি আমার পরিবারের মধ্যে প্রথম কলেজে যাওয়া লোক । আমার আগে আমাদের গুষ্ঠির কেউ কলেজের ধারিতে (বারান্দায়) যায় নাই ।

একদিন ক্লাস শেষে আমরা সবাই মিলা গেলাম আমাদের গ্রামের বাজারে, উদ্দেশ্য ডিবির ফরম ফিলাপ করা । আমার ক্লাসের সব বন্ধুরা ফরম ফিলাপ কইরা চিঠি ছাড়ল কিন্তু আমি ছাড়লাম না । বিদেশ মিদেশ যাবার সখ আমার কোন কালেই আছিল না । আমি ফরম ফিলাপ করি নাই ব্যাপারটা আমার বাল্যকালের বন্ধু জমশেদের চোখে পরল । সে আমারে বলল তুই ফরম ফিলাপ করলি না ক্যান ? সবাই করছে , শুন জীবনে আয় উন্নতি করতে হইলে সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে হয়। তুই এক্ষনি ফরম ফিলাপ করবি। বন্ধু হিসাবে তোরে আমি আদেশ দিতে পারি না তয় ভালো উপদেশ দিতে পারি। এরপর সে একরকম জোর জবরদস্তি করে আমার চিঠিটাও ছাড়ল ।

ভাগ্য দেখেন ! ক্লাসের মধ্যে একমাত্র আমার লটারি লাইগা গেল । অন্য কারো লাগলো না !

লটারিতে আমার নাম উঠেছে এই চিঠি আসার পর জমশেদ আমারে বলল কিরে ?কি কইছিলাম তোরে মনে আছে ? দেখ আল্লাহর লীলা খেলা ! তুই ভাগ্যবান মানুষরে হোসেনা অতি ভাগ্যবান। অহন হাঁটে চল। মিষ্টি খাওয়াবি।

অথচ জানেন ভাই সাহেব ? ভিসা পাওনের পরও আমার এইখানে আসার তেমন একটা ইচ্ছা ছিল না। আমি যখন আমার মায়েরে বললাম আম্মা আমি আমেরিকায় যামু না। কথা শুইন্যা আমার মা খুব রাগ করলেন।

আমারে বললেন ক্যান যাবি না ? দেশে থাইকা করবিটা কি ? হালের বলদ নিয়া হাল বাইবি ? লোকে এই দেশে পড়াশুনা কইরা চাকরি মাকড়ি কিছু পায় না। তালুকদার বাড়ির বশির রে দেখ। মাস্টার ডিগ্রি পাশ পোলা। তিন বছর ধইরা ঘরে বইয়া রইছে। তুই কি হের্ মতন হবি ?

ভাইবা দেখ হোসেন , আম্রিকা যাবার কপাল সবার হয় না ? এই লটারি হইলো খোদার রহমত তুই তারে পায়ে ঠেইলা দিতে চাস ?

মায়েরে আমি বললাম আম্মা ওই দেশে আমি কাউরে চিনি না , হেগো ভাষা জানি না। ( (ভাই সাহেব তখন আমার বয়স অনেক কম , নতুন এক দেশে যামু এইটা আমার সাহসে দিতেছিল না )

আমার কথা শুইন্যা মায় আমার দিকে অবাক হয়া তাকায়।

ওমা ! কি কয় পাগল ছেলে ! কাউরে চিনস না , ভাষা জানস না হেইটা কোন যুক্তি হইলো। শোন আমি কুনু কথা শুনে চাই না। তুই আম্রিকা যাইতাছস এইটাই মার্ শ্যাষ কথা !

পরিবারের লোকজনের চাপে শেষপর্যন্ত এইখানে আসলাম । দেশ ছাইড়া যাওয়াটা যে কি কষ্টের সেইটা আমি টের পাই বিমানে উঠার পর । কষ্টে আমার কইলজাটা চুরমার হইয়া গেছিল । ভাবতেছিলাম কি হইব বিদেশ গিয়া ? নিজের দেশেইতো ভাল আছিলাম ।

আইলাম নতুন দেশে । উঠলাম এক দুঃসম্পর্কের আত্মীয়র বাড়িতে। শুরু হইলো আমার আমেরিকার জীবন , এক ফ্যাক্টরিতে কাজ পাইয়া গেলাম। কাজটা সহজ । পেলাস্টিকের পুতুল বানানো । কাজ করি রাইতের শিফটে বাসায় ফিইরা সারাদিন ঘুমাই। থাকি এক বাংলাদেশী পরিবারের সাথে। প্রায় আট বছর ওইখানে থাকার পর আমি দেশে যাই বিয়ে করতে। আমার মা বাবা কনে ঠিক করে রেখেছেন। মেয়ে আমাদের সুনামগঞ্জেরই । ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে। নাম শায়লা । আমি দেশে ফিরার দশ দিনের মাথায় আমাদের পানচিনির অনুষ্ঠান হইলো।

পান চিনি’র অনুষ্ঠানে আমি তারে একটা আংটি দিলাম যা আমি দুবাই বিমানবন্দর থাইকা খরিদ করেছিলাম । আংটির সাথে আরও দিলাম নগদ দশ হাজার এক টাকা । বিয়ের দিন তারিখ পাকাপাকি ভাবে ঠিক হইলো পান-চিনির দিন বিকালে । রমজানের ঈদের পর বিয়ে । তখন মাত্র একমাস বাকি !

আমি হোসেন আলিকে প্রশ্ন করলাম এই এক মাসে আপনার হবু স্ত্রীর সাথে দেখা করেছিলেন ?

জি ভাই সাহেব , আমি আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুরে নিয়া তার কলেজে গিয়েছিলাম । উদ্দেশ্য দেখা করা , দুই একটা কথা বলা। তারে ভালমতন দেখার সুযোগ পাই নাই ভাবলাম দেইখা আসি । আমি ব্যাপারটা বাড়ির কাউরে জানালাম না । আমাদের বাড়ির লোকজনের চিন্তাধারা একটু বেশি রক্ষণশীল। গেলাম তাঁর কলেজে । আমার বেশ লজ্জা লাগতেছিল। আমারে দেইখা সে আবার যদি কিছু মনে করে ? কলেজে গিয়া আরেক ফ্যাঁকড়ার মইধ্যে পরলাম । মেয়েদের কলেজ। ভিতরে ঢুকা যায় না । ভাবতেছি কি করব ? জমশেদ রে বললাম , এইভাবে আসাটা কি ঠিক হইলো ?

জমশেদ বলল এতো ভাবস ক্যান ? তুইতো এই মাইয়ার লোগে প্রেম করতে আসছ নাই। কয়দিন পর তগো বিয়া।

বুঝলাম এখন দেখা করি কেমনে ?

জমশেদ এক কাজ কর। বলল তুই দারোয়ানের হাতে পঞ্চাশটা টাকা ধরায়া দে । দারোয়ান টাকা পাইয়া ওরে ডাইকা আনব।

আমি বাইরে দাঁড়ায় আছি দেইখা সে খুব অবাক হল আমার কাছে মনে হইলো সে কিছুটা লজ্জাও পেয়েছে । আমি নিজেও অবাক হলাম। সে যে এতো সুন্দরী সেইটা আমি আগে খেয়াল করি নাই । পান-চিনির অনুষ্ঠানে মাত্র কিছুক্ষণ সে আমার পাশে ছিল। লজ্জায় আমি তাঁর দিকে ভালমতন তাকাই নাই ।

তাকে দেইখা মনে হইলো সে অসুস্থ , কথা বলতেও কষ্ট হইতেছিল আমারে জানাল দুই দিন ধইরা তাঁর খুব জ্বর ।আমি তাকে বললাম চলেন আপনাকে বাসায় নামায়া দেই।আমার সাথে মাইক্রো আছে । (মাইক্রোবাস )

তারে নামায়া দিলে লোকজন কি ভাববে বিধায় সে রাজি হইল না।

তারে বললাম আপনে বাসায় গিয়া রেস্ট নেন। এইডা শুইনা সে হাইসা বলল দুইদিন পর রমজানের ছুটি শুরু হইব। তখন প্রচুর রেস্ট নেয়া যাবে । আমি বাড়িতে ফিরা আসলাম । মেয়েটারে আমার খুব পছন্দ হল ।

তখন রমজান মাস । দশ কিংবা বারো রোজা হইবে । দেশে খুব গরম। আমাদের গ্রামে তখনও ইলেক্ট্রিসিটি আসে নাই। আমার খুব কষ্ট হইতেছিল। আমেরিকায় থাইকা আমার গায়ের চামড়া মনে হয় মোটা হইয়া গেছে । সারাক্ষণ খালি গরম লাগে । সেদিন ইফতারের আগে আমাদের বাড়িতে মেয়ের মামা আইসা হাজির।

আমার বাবা তাকে দেখে খুব অবাক হলেন, তারপর ব্যস্ত হয়া পড়লেন। মায়েরে বললেন নতুন কুটুম এভাবে না বইলা আসাটা ঠিক হয় নাই, তুমি ভালো খাবারের ব্যবস্থা করো । আমি খাসি জবেহ করার ব্যবস্থা করতেছি ।

আমার হবু মামা শ্বশুর বাবাকে বললেন, বেয়াই সাহেব আমি বেশিক্ষণ থাকব না। আপনার সাথে আমার একান্তে জরুরি কিছু কথা আছে।

বাবা উনারে অন্দর মহলে নিয়া বসালেন।

আমি তাকে প্রশ্ন করলাম তাঁদের মধ্যে কি কথা হয়েছিল ? কথা বলার সময় আপনি কি সামনে ছিলেন ?

হোসেন আলী বললেন , জি না ভাই সাহেব । তাদের মধ্যে কি কথা হয়েছিল সেটা আমরা সবাই শুনি ইফতারের সময়। আমার বাবা একটি চাপা স্বভাবের মানুষ। উনারে খুব চিন্তিত মনে হল । ওইদিন সবাই মিলা যখন ইফতার করতে বসেছি আমি আমার বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম

আব্বা , উনি কেন এসেছিলেন ?

আব্বা বললেন, তোমার সাথে এই ব্যাপারে আমি রাত্রে কথা বলব বলে ভাবছিলাম কিন্তু তুমি যখন প্রশ্ন করেছো আমার উচিত তোমার প্রশ্নের জবাব দেওয়া ।

বাজান , ওই মেয়েরে তোমার বিবাহ করা সম্ভব না। তার কারণ মেয়েটা জটিল রোগে আক্রান্ত। ওই জরায়ুতে ক্যান্সার ধরা পড়েছে । সে যদি ক্যান্সার থাইকা নিস্তারও পায় সে কোনদিন মা হতে পারবে না। আমি তোমার বাবা। তোমার ভালোমন্দ দেখার অধিকার আমার আছে।

ভাই সাহেব , বাবার মুখে এই কথা শুইনা আমার মনটা খারাপ হইল । বারবার মেয়েটার মায়াবী চেহারা আমার চোখের সামনে ভাসতে লাগল । একবার মাত্র তাঁরে দেখেছি । যদিও তারে সুস্থ মনে হইছিল কিন্তু সে যে এমন জটিল রোগে আক্রান্ত তা কে জানতো ? পেটে প্রচণ্ড খিদা স্বত্বেও আমার মুখে কিছুই দিলাম না । আমার খাবার রুচি নষ্ট হয়া গেছিল। আমি ভাত নাড়াচাড়া করতাছি দেইখা আমার মা আমাকে বললেন,

বাবারে , আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন। যদি বিয়ের পর এই রোগ ধরা পরত ? তখন তুই কি করতি ? হেরা লোক ভালো। আমি তোর জন্য নতুন মেয়ে দেখব। চিন্তার কোন কারণ নাই আর দেশে মেয়ের আকাল পরে নাই ! আমি ঐ মেয়ের চেয়ে আরও অনেক সুন্দর মেয়ে তোর জন্য আনব ।

রোজার ঈদের শেষে আমি আমেরিকায় ফিইরা আসলাম। আমার ছুটিও তখন প্রায় শেষ । আমার প্ল্যান ছিল বিয়ের পর বৌরে বাড়িতে তুইলা আমি আমেরিকায় আসব। ডিসেম্বর মাসে আবার দেশে যাব। তারে নিয়া কক্সবাজার , রাঙামাটি , সুন্দরবন দেখব। এইসব জায়গায় আমার কখনও যাওয়া হয় নাই।

আমেরিকা আসার তিন মাসের মাথায় আমার ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়া গেল। আমি এতে মোটেও বিচলিত হইলাম না তার কারণ আমার হাতে জমানো টাকার পরিমাণ অনেক। আমি একা মানুষ। কোন বদভ্যাসও ও আমার নাই। গত আট বছরে আমি অনেক টাকা জমিয়ে ফেলেছি। ঠিক করলাম আবার দেশে যাবো। পাঁচ ছয় মাস দেশে থাকব।

আমি যখন দেশে ফেরত যাই তখন আমার মা বাবা মেয়ে দেখতেছেন। দুই এক জায়গা থেকে ভাল সম্বন্ধ এসেছে। দেশে যাবার এক সাপ্তাহের মাথায় আমার ছোট চাচার হার্ট এটাক করল। উনি বিশিষ্ট ব্যক্তি । কবি মানুষ। সুনামগঞ্জের পত্রিকায় প্রায়ই তার কবিতা ছাপা হয় । বিয়াশাদী করেন নাই । একলা জান । এই চাচার সাথে আমার সম্পর্ক বন্ধুর মতন যদিও বয়সে উনি আমার চেয়ে অনেক বড়।

তারে সিলেটে নিয়া গেলাম । ভর্তি করলাম নিরাময় ক্লিনিকে, ডাক্তার খালিক সাহেবের ক্লিনিক। উনি সিলেটের নামকরা ডাক্তার। তার চিকিৎসায় চাচার অবস্থার কিছুটা উন্নতি হইল। একদিন দুপুরবেলা হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়াইয়া ডাক্তারের সাথে কথা বলতেছি তখন একজন নার্স আইসা বলল , আপনারা একটু সইরা দাঁড়ান ওই কেবিনে রুগী ঢুকবে।

ভাই সাহেব , আমি আর ডাক্তার সাহেব সইরা দাঁড়াইছি, তখন দেখি যে মেয়েটার সাথে আমার পান-চিনি হইছিল সেই মেয়েটারে স্ট্রেচারে কইরা কেবিনে নিয়া যাইতেছে । সে আমার দিকে তাকাইল । তাঁর চোখের দিকে তাকায়া আমি আমি বুঝতে পারলাম সে আমারে চিনতে পারছে ।

আমি তাঁর দিকে তাকাইয়া আছি । মুখটা কেমন জানি শুকাইয়া গেছে । আমি মনে মনে ঠিক করলাম তার সাথে কথা বলব। তাঁর শরীরের অবস্থা কেমন এইসব জিগ্যেস করব । হঠাৎ কইরা কেবিনে ঢুইকা তাঁর সাথে কথা বললে লোকজনে কি ভাববে বিধায় আমি সুযোগের অপেক্ষায় থাকলাম। তার কারণ তাঁর সাথে তখন অনেক লোক। একদিন সুযোগ হল । তাঁর সাথে যে কাজের বেটি ছিল সে গোসল করতে গেছে ভাবলাম, সুযোগটা কাজে লাগাই ।

আমি তাঁর কেবিনে ঢুকলাম । সে বিছানায় আধশোয়া হয়ে বইসা ছিল । আমি রুমে ঢুকছি দেইখা সে সুন্দর কইরা হাসল । তার এই হাসি দেইখা মনে হইল সে জানতো আমি তারে দেখতে আসব । তাঁর মুখে হাসি দেইখা আমি ভাবতেছি মৃত্যুর কাছাকাছি একজন মানুষ এতো সুন্দর কইরা হাসে কেমনে ? তাঁর বিছানার কাছে একটা চেয়ার পাতা ছিল । সেখানে বসলাম ।

সে আমারে বলল , আমি জানতাম আপনে আসবেন ।

আপনে কেমনে জানতেন যে আমি আসব ?

জানিনা আমার মন বলতেছিল আপনে আসবেন । আমার মনের কথা সবসময় ফলে !

আপনার শরীর কেমন ?

আর শরীর ! মাঝেমধ্যে পেটে ব্যথা করে , অল্প একটু খাইলেই মনে হয় পেট ভইরা গেছে আরও কিছু মেয়েলি সমস্যা হয় সেইটা তো আপনেরে বলতে পারিনা ।

আমি বললাম বলার দরকার নাই।

একবার তারে জিজ্ঞাস করলাম আপনার কি কিছু খাইতে মন চায় ?

সে হাইসা বলল আমার যে জিনিসটা খাইতে মন চায় সেইটা তো আমাগো দেশে নাই ।

কি জিনিস ? আপনে বলেন আমি নিয়া আসব ।

সে বলল স্ট্রবরি (স্ট্রবেরি) খাইতে মন চায়। কি সুন্দর একটা ফল ? লালা টুকটুকা ! সেইদিন পত্রিকায় দেখলাম। আপনে খাইছেন কখনো ? জানেন আজকাল যেই আমারে দেখতে আসে হেগো সবারই এক প্রশ্ন। কি খাইতে চাও। আমি ইচ্ছা কইরা উল্টা-সিধা খাবারের নাম বলি। হি হি হি

প্রিয় পাঠক , সিলেটের সেই ক্লিনিকের কেবিন থেকে এবার নিউ জার্সিতে ফিরে আসি । গল্পের এই পর্যায়ে হোসেন আলী সাহেবের মা ঘরে ঢুকলেন। ভদ্রমহিলার মাথায় ঘোমটা , পরনে সবুজ রঙের তাঁতের শাড়ি। উনি তার ছেলেকে বললেন আমি ভাত বাড়ছি তুই উনাগো নিয়ে খাইতে আয়। তখন রাত প্রায় দশটা । আমি আমার বন্ধু আর হোসেন আলী খেতে বসলাম । হোসেন আলী সাহেবের মায়ের রান্না অসাধারণ। অনেক পদ রান্না করেছেন। আমরা খাচ্ছি। গল্প আবার শুরু হল।

হোসেন আলী আমার দিকে তাকিয়ে বললেন সেইদিন ক্লিনিকে তাঁর সাথে কথা বলার পর বুঝলেন ভাই সাহেব আমি জানি না আমার যে কি হইলো আমি ঠিক করলাম আমি এই মেয়েকে বিবাহ করবো। আমার চাচার শরীর তখন ভালো হয়েছে। ডাক্তার বললেন উনারে নিয়ে যেতে পারেন। আমি গ্রামে ফিরা আসলাম । আমার মনটা পইরা থাকল সেই ক্লিনিকে । আমার কাছে মনে মনে হইলো আমি প্রেমে পরছি , সারাক্ষণ তাঁর কথা মনে পড়ে , সারাক্ষণ ইচ্ছা করে তারে দেখতে , কথা কইতে ।

গ্রামে ফিরার পর আমি মায়েরে যখন আমার ইচ্ছার কথা বললাম উনি খুব রাইগা গেলেন । বললেন তর কি মাথা খারাপ হয়া গেছে হোসেন ? বেমারি (অসুস্থ) একটা মাইয়া কয়দিন বাঁচব তাঁর নাই ঠিক । যদি সে ভালো হয় তার কুনুদিন বাচ্চাকাচ্চা হইবো না। নাতি নাতনি দেখার শখ কি আমাগো নাই ? পরিবারের বড় পোলা তুই !

জানেন ভাই সাহেব ? পুরা পরিবারের লোকজন আমার উপর ক্ষেইপা গেল। আমার মা আমারে বললেন তুই বাড়ি থাইকা যা গা। তোর মতন কুলাঙ্গার সন্তানের আমার দরকার নাই।

ওই দিন হাইঞ্জাবালা (সন্ধ্যাবেলা ) আমার বাবা বাড়ির চেঁচিতে (উঠানে ) বইসা হুক্কা টানতেছেন । আমি তার কাছে গিয়া বসলাম। এই বিষয় নিয়ে বাবার সাথে আমি তখনও কোন আলাপ হয় নাই। তবে উনি জানেন আমি যে মেয়ে টারে বিবাহ করতে চাই আম্মা উনাকে ব্যাপারটা বলেছেন । আব্বারে বললাম , আব্বা মেয়েটারে বিবাহ করলে তার ভালো এলাজ (চিকিৎসা) হবে। আমেরিকায় ক্যান্সারের ভালো ডাক্তার আছে , ক্যান্সারের হাসপাতাল ও আছে ।

আমার বাবা বিচক্ষণ ব্যাক্তি । উনি কিছুক্ষন কোন কথা বললেন না । চুপচাপ বইয়া থাকলেন । উনারে খুব চিন্তিত দেখাল । কিছুক্ষন পর আমার দিকে তাকায়া বললেন , ঠিক আছে । আমি মেয়ের বাবার সাথে আলাপ কইরা দেখি ।

আমাদের বিবাহ হয় এর ঠিক পনেরো দিন পর । আমার বাবা , ছোট চাচা আর আমার কিছু ঘনিষ্ঠ বন্ধুবান্ধব আমার সাথে বরযাত্রী যায়। আমার মা যান নাই পরিবারের অনেকেই যান নাই । বিবাহ ব্যাপারটা আনন্দের , দুইটা পরিবারের মিলন , দুইটা মনের মিলন। কিন্তু জানেন আমার বিয়ার দিন আমার মায়ের কান্নাকাটি দেইখা মনে হয় নাই এইটা কোন বিয়া বাড়ি। মনে হইছিল এই বাড়িতে কেউ মারা গেছে , আমার মতে বাড়ির লোকজনের আত্মার মৃত্যু হইছে। উনারা যান নাই আমি এতে কিছু মনে করি নাই । জীবনটা আমার । আমি স্বেচ্ছায় এই মেয়ের সাথে ঘর করতে রাজি হইছি । ভুল করতেছি না শুদ্ধ করতেছি সেইটা পরে দেখা যাবে আগে মেয়েটার চিকিৎসার দরকার ।

বিয়ার পরপরই আমি শায়লার পাসপোর্ট ও কাগজপত্র নিয়া ঢাকায় আমেরিকান দূতাবাসে যাই তাদেরকে আমার স্ত্রীর শারীরিক অবস্থার কথা জানাই । বলি তারে কি এখনই আমেরিকা নিয়ে যাওয়া সম্ভব ?

তারা আমারে আমেরিকায় গিয়া আমার স্ত্রীর ভিসার জন্য এপ্লাই করতে বলে । বাংলাদেশ থেকে এপ্লাই করার কোন নিয়ম নাই । আমি তাড়াতাড়ি আমেরিকা ফেরত আসি । ফেরত আসার দুই দিনের মইধ্যে তাঁর জন্যে এপ্লাই করি ।

যেইখানে স্বামী স্ত্রীর জন্যে এপ্লাই করলে এক বছর সময় লাগে সেইখানে আমার স্ত্রী ভিসা পাইয়া যায় পাঁচ মাসের মাথায় । এই পুরা ব্যাপারটা আমার কাছে খুব অবাক লাগছে ! সে ভিসা পাবার পরপরই আমি দেশে যাই অরে এইখানে নিয়া আসি । তাঁর শরীরের অবস্থা তখন বেশি ভালো না ।চার / পাঁচটা কেমোথেরাপির পর সে খুব দুর্বল , মুখের ভিতর ঘা , কিছু খাইতে পারে না । এইখানে আসার পর তারে হাসপাতালে ভর্তি করি । তাঁর এলাজ শুরু হয় ।

জানেন ভাই , মানুষটা খুব কষ্টে ছিল । আমারে প্রায়ই বলত, আপনে কেন আমারে বিবাহ করে এই যন্ত্রণার মধ্যে পরেছেন । একদিন তাঁর জন্য স্ট্রবেরি আনছিলাম । সেই স্ট্রবেরি দেইখা সে কি যে খুশি হয়েছিল তয় একটাও খাইতে পারে নাই । মুখে ঘা ছিল । সে ঘুরতে পছন্দ করতো । তাঁর শরীর একটু ভালো থাকলে আমরা দুইজনে মিইল্যা এইখানেওইখানে ঘুরতে যাইতাম , তাঁরে নিয়া অনেক জায়গায় ঘুরছি । একবার তারে নিয়া সমুদ্র সৈকতে গেলাম । ছোট ছোট
কাপড় পড়া মেয়েমানুষ দেইখা সে হাসতে হাসতে শেষ । আমি তাঁরে জিগাইলাম বউ হাসো ক্যান ? সে বলল এই দেশের মাইয়া মাইনষের লাজ শরম বইলা কিছু নাই । হাজার মাইনষের সামনে মা , বেটি হগলে নাঙ্গা ! আরেকবার গেলাম গেরেট মাউন্টেন । এ কথাটা বলার পর হোসেন আলি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন

-ভাইসাহেব কি কখনো গেরেট মাউন্টেন গেছেন ?

-আমি বললাম , না যাই নাই ।

-অতি চমৎকার জায়গা । শায়লায় খুব পছন্দ হইছিল ।

হোসেন আলি হঠাৎ করে চুপ হয়ে গেলেন। আমাকে বললেন আমি এখনো সময় পাইলে ওই জায়গায় যাই। পুরানা দিনের কথা মনে পরে। সব কিছু আগের মতনই আছে কিন্তু আমার শায়লা নাই। একবার কি হইছে শুনেন। শায়লারে বললাম বৌ চল তোমারে আমেরিকান নাস্তা খাওয়াই।

-সে বলল হেগো খাবার কি হালাল ? হেরা তো শূকর খায় !

আমি হাইসা বললাম ,আরে পাগল মাইয়া আমি কি তোমারে শূকর খাওয়ামু ? আমরা খামু আমেরিকান ডিম ভাজা। এইটার আবার একটা নাম আছে ।

-কি নাম ? শায়লা অবাক হইয়া আমার দিকে তাকায়।

-ওমলেট।

– ও বুঝছি ! “এরা মামলেট রে কয় ওমলেট ”

গিরিক (গ্রিক) ডাইনারের খাওন তার খুব পছন্দ হইছিল। তারে নিয়ে অনেকবার গেছি। মজার ব্যাপার হইলো আমরা যখনি ওই ডাইনারে খাইতে যাইতাম ডাইনারের ওয়েইট্রেস আমাগোরে দেইখাই বলত ওমলেট এন্ড টোস্ট। হা হা হা । আরেকবার তারে নিয়া আটলান্টিক সিটিতে গিয়েছিলাম । সে স্লট মেশিনে ২০০ ডলার জিতছিল । তাঁর আনন্দ কে দেখে ? বাসায় ফিরার সময় সে ওই টাকা আমার পকেটে ঢুকাইয়া বলছিল এইটা আপনে রাখেন । স্ত্রী হিসাবে আপনারে তো কোনভাবেই খুশি করার সাধ্য আমার নাই যদিও সাধ আছে ! এই টাকায় আপনে সুন্দর একটা জামা কিনবেন । ওই সময় সে বাসায় থাকত । সাপ্তাহে দুইবার তাঁর কেমো নিতে হয় , কিন্তু তাঁর শরীরের কোন উন্নতি হয় না । তারে আবার হাঁসপাতালে ভর্তি করলাম ।

এক রাতে আমি তাঁর কেবিনের সোফায় শুয়ে আছি । তন্দ্রার মতন আসছে । সে আমারে ডাকল। এই যে শুনতেছেন ?

-কি ?

-আপনারে একটা কথা বলার ছিল।

-বল।

-আপনের খুব কষ্ট হইতেছে তাই না ?

-আমি হাইসা বললাম, অন্য কিছু বল। তুমি দিনে দশবার এই একই কথা কও !

-সে হাসল , আপনারে দুইটা কথা বলি, কিছু মনে নিয়েন না

-মনে নেওয়া নেওয়ির কি আছে বৌ ? তোমার যা ইচ্ছা বল।

আমার কাছে আসেন , আমি তাঁর কাছে গেলাম সে বলল আমার হাত ধরেন।

আমি তাঁর হাত ধরলাম ।

সে বলল , আমারে কথা দেন । আমার মৃত্যুর পর আপনে আরেকটা বিবাহ করবেন। আমার কেন জানি মনে হইতেছে আমার হাতে সময় আর বেশি বাকী নাই। আপনে আমার জন্যে যা করছেন তার প্রতিদান দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না। ফেরেশতার মতন মানুষ হয় আমি শুনছি কিন্তু আমার ভাগ্যে যে এমন একজন ধরা দেবে কখনো ভাবি নাই।

ভাইসাহেব কথাগুলা শুইন্যা আমার চোখে পানি এসে গেছিল।মানুষের মন বরই বিচিত্র সেই রাইতে আমার কেন জানি মনে হইতেছিল তার সাথে এইটাই আমার শেষ কথা।

আমার স্ত্রী মারা যায় এর পরের দিন দুপুরবেলা। আমি তখন কাজে। আমেরিকায় আসার পর আট মাস বাঁইচা আছিল । সেই আটটা মাস ছিল আমার আমার জীবনের অতি আনন্দের !

গল্প শেষ হয়েছে । পুরো ঘর জুড়ে তখন পিনপতন নীরবতা । হোসেন আলী সাহেব মাথায় নিচু করে চুপচাপ বসে আছেন । আমি বুঝতে পারছি তাঁর চোখ অশ্রুসিক্ত । আমরা দুজনও চুপচাপ । মানুষের কষ্টের গল্প শোনা কঠিন । এ সাদামাটা লোকটি যে ভালোবাসার মহা সমুদ্র হৃদয়ে ধারণ করে বসে আছেন তা কে জানতো ?

আমি মাথায় তখন অন্য চিন্তা । ভাবছি তাঁকে একটা প্রশ্ন করব । আপনি কেন আর বিয়ে করলেন না ? কিন্তু প্রশ্ন করাটা কতখানি সমীচীন ? দোটানায় আছি । আমাকে সে প্রশ্ন করতে হলো না , তিনি নিজেই বললেন ।

আপনে হয়তো এখন আমারে জিগ্যেস করবেন আমি কেন আর বিবাহ করি নাই ?

আমি কিছু বললাম না । আমি চাচ্ছি উনি নিজের থেকেই বলুক ।

ভাইসাহেব আমি আমার জীবনে কখনো কোন প্রেম করি নাই , শায়লা আমার প্রথম প্রেম , আমার প্রথম ভালবাসা । মৃত্যুর আগে সে আমারে বলেছিল আমি যেন আবার বিবাহ করি । আমি তাঁর কথাটা রাখতে পারি নাই । শায়লার জায়গায় অন্য কারোরে আমি কল্পনাও করতে পারি না । যখন তাঁর কথা ভাবি আমার খুব কষ্ট হয় । পানি যেমন অনেক ঠান্ডা হতে হতে এক সময় বরফ হয়ে যায়, ঠিক তেমনি একটা মন অনেক কষ্ট পেতে পেতে এক সময় পাথর হয়ে যায় , ভাইরে আমার মনটা পাথর হয়ে গেছে ।


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত মৃদুভাষণ - ২০১৪
Design & Developed BY ThemesBazar.Com